লেখক

ঊর্মি প্রিয়া দাস, শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

রাকিবুল রাকিব, শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

এ আলোচনায় আমরা মিশেল ফুকোর আধুনিক হাসপাতাল ও মেডিসিন প্রসঙ্গে চিন্তাগুলো হাজির করবো। মিশেল ফুকো বিশ শতকের মশহুর ফ্রেঞ্চ চিন্তাবিদ। ফুকোর চিন্তা কলা ও মানবিক অনুষদতো বটেই তথাপি সামাজিক বিজ্ঞানের প্রায় প্রতিটি শাখাকে আলোড়িত করেছে। ফুকো ১৯৭৪ সালের অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরিও শহরের সোশাল মেডিসিন ইনস্টিটিউটে তিনটি লেকচার পেশ করেন। এ আলোচনা সেই তিনটি লেকচারের সারসংক্ষেপ, সাথে বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে লেখা।

১.

হাসপাতাল প্রসঙ্গে মিশেল ফুকো একটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে আলোচনায় প্রবেশ করেন যে, রোগীর অসুস্থতায় হস্তক্ষেপ, রোগের ফলাফল নির্ণয় ও রোগ নিরাময়ে কখন হাসপাতাল একটি সুসংগঠিত চিকিৎসা কেন্দ্র আকারে বিবেচিত হল? ফুকোর মতে, হাসপাতাল সুসংগঠিত চিকিৎসা কেন্দ্র আকারে বিবেচিত হওয়া অপেক্ষাকৃত আধুনিক ধারণা, যা আঠারো শতকের শেষদিকে গোচর হয়।

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে ফুকো দুটি ব্যাপার বিশেষভাবে চিহ্নিত করেন। একটি হাসপাতাল, আরেকটি মেডিসিন। কার্যত এ দিয়েই চিকিৎসা সেবা দীর্ঘদিন ধরে দেয়া হচ্ছে। তাই ফুকো হাসপাতাল ও মেডিসিনের উৎপত্তি ও বিকাশের পর্যায়ের প্রবণতাগুলো ধরে আলোচনা করেন। ফুকো অন্তত পশ্চিমের পাঁচশো বছরের প্রবণতাকে চিহ্নিত করে আধুনিক হাসপাতাল ও মেডিসিনকে বুঝতে চেয়েছেন। পশ্চিমে মধ্যযুগের চিকিৎসাব্যবস্থা ছিল চার্চকেন্দ্রিক, চার্চে ভবঘুরে, পাগল, গণিকা, ও অসুস্থ গরীব লোকজন চিকিৎসা নিত। বিশেষ করে যাদের ব্যক্তিগত চিকিৎসক রাখার সাধ্য ছিল না। শহরের ক্ষমতাশালীরা যেসব গরীব ও অপরিচ্ছন্ন মানুষকে বিপদজনক মনে করতো তাদের চার্চে চিকিৎসার ব্যবস্থা করাতো। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যেসব মানুষ একটু আধ্যাত্মিক সুখ কামনা করতো, তারাও  চার্চে গিয়ে আধ্যাত্মিক সেবা নিত। সেকালে ইংরেজি প্যাসেন্ট (patient) শব্দটি শুধুমাত্র গরীবদের বেলায় ব্যবহার হত। ফলে ফুকোর মতে, আধুনিকঅর্থে হাসপাতালের ধারণা আমরা মধ্যযুগে দেখতে পাই না।

ফুকো ইউরোপে প্রথম বৃহৎঅর্থে হাসপাতালের ধারণা দেখতে পান সৈনিক ও নাবিকদের মধ্যে। দেশ দখল ও রক্ষায় সৈনিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সৈনিকের বেতন বেশি ছিল, প্রস্তুতি ও জীবনযাপনের পিছনে প্রচুর ব্যয় হত। অনেকসময় তারা কাজে ইচ্ছাকৃতভাবে ফাঁকি দিত  এবং নিজের কাজ সম্পর্কে অবগত থাকতো না। আবার দেশ জয়ে রওনা দেয়ার পর অনেক সৈনিক মারা যেত। সেসময় তাদের মেধা ও শ্রম সর্বোচ্চ ব্যবহার করা ইউরোপের কোনো শক্তিশালী দেশের পক্ষেই তেমন সম্ভব হত ছিল না। যেকারণে মধ্যযুগের চার্চকেন্দ্রিক হাসপাতালগুলোর মডেল ধীরে ধীরে সৈনিক ও নৌ কর্মকর্তাদের জন্য ব্যবহার শুরু হয়। এ ব্যবস্থা সতেরো শতকে শুরু হয়, আঠারো শতকে উন্নতি লাভ করে। সৈনিক হাসপাতালগুলো শুধুমাত্র চিকিৎসার জন্য ব্যবহার হত না, বরং এর অন্য রাজনীতি ছিল। ফুকো যার নাম দেন ডিসিপ্লিনারি রাজনীতি। ডিসিপ্লিন (অনুশাসণ) ক্ষমতার একটি টেকনিক, যা নজরদারির শ্বাশত ব্যবস্থা। আঠারো শতকের ইউরোপে এটি এমন এক ক্ষমতা ব্যবস্থা হিসেবে গোচর হয় যা পূর্বের সার্বভৌম ক্ষমতার (sovereign power) চেয়ে আলাদা। আঠারো শতকে ডিসিপ্লিনারি রাজনীতি শুধুমাত্র সৈনিক হাসপাতালের বেলায় গোচর হয়নি, অন্যান্য ক্ষেত্র যেমন- স্কুল-কলেজ, কারখানা, প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও দেখা যায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেখা গেল শিক্ষক একে একে ক্লাসের সব ছাত্রদের ডেকে কার কি কাজ তা বুঝিয়ে দিচ্ছে এবং সেই কাজ ছাত্ররা সুচারুভাবে সম্পাদন করছে। সৈনিকের বেলায় দেখা গেল প্রত্যেকে নিজ নিজ অর্পিত দায়িত্ব পালন করছে, সাথেসাথে ইউনিট হিসেবেও ক্রিয়া করছে; এখানে একেকজনের কাজ একেকরকম, একেক ইউনিটের দায়িত্ব এককজনের হাতে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন প্রশাসনিক ক্ষমতা চর্চার জায়গা তৈরি হয়ে গেল, সাথে ব্যক্তিকে নজরদারির মাধ্যমে শ্রমের সর্বোচ্চ ব্যবহার কাজে লাগানো সম্ভব হল। সৈনিক ও নৌ হাসপাতালগুলো যখন আধুনিক পাবলিক হাসপাতালে রুপান্তরিত হল, সেখানেও একই ঘটনা দেখা গেল। আধুনিক পাবলিক হাসপাতালের ধারণা মোটামুটি আঠারো শতকের শেষে দিকে দেখা যায়। আধুনিক হাসপাতালে রয়েছে ক্ষমতা কাঠামোর স্তর ভিত্তিক বিন্যাস। সেখানে আছে প্রশাসক, নার্স, ডাক্তার, ক্লিনারের সমন্বয়ে সামগ্রিক এক ব্যবস্থা। একেকজনের ক্ষমতা একেকরকম, প্রত্যেকের হাতে কিছু না কিছু ক্ষমতা দেয়া আছে। ফলে আধুনিক হাসপাতাল হচ্ছে ক্ষমতা চর্চার শ্বাশত ব্যবস্থা। 

২.

মধ্যযুগের হাসপাতালগুলোতে প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর ব্যবহার তেমন দেখা যায়নি বরং রোগ নিরাময় ও অধ্যাত্মিক সেবা দিতে দেখা যেত। আধুনিক পাবলিক হাসপাতালের ধারণা বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে হাসপাতালের স্থাপত্য, ডিজাইন, কক্ষের সুসজ্জা ইত্যাদি বিষয়ের উপর গুরুত্ব দেয়া হয়। আঠারো শতকের শেষদিকে একদিকে একাডেমি অফ সায়েন্সের পক্ষ থেকে জ্যাকস টেনন,  অন্যদিকে ইংরেজ জন হাওয়ার্ড ইউরোপের নানান কারাগার, হাসপাতাল, গরীব-দুস্থদের ঘর পরিদর্শন করে। এরপর তারা এমন কতগুলো সিদ্ধান্ত দেয়, যেগুলোর প্রায় সবই হাসপাতালের স্থাপত্য ও ডিজাইন সম্পর্কিত। এর পূর্বে হাসপাতালের কোনো নির্দিষ্ট অবকাঠামো ও প্রোগ্রাম ছিলনা। হাসপাতাল ছিল অগোছালো ও অপরিষ্কার। টেনন ও হাওয়ার্ড হাসপাতালের কাঠামো পরিবর্তন করা, বেড সংখ্যা বৃদ্ধি বা রোগীর যথাযথ পরিবেশ নিশ্চিত করা, সাথেসাথে হাসপাতালকে রোগ নিরাময়ের চূড়ান্ত স্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কথা বলে। ফুকোর মতে, মূলত তাদের পর্যবেক্ষণ ছিল ষোলো ও সতেরো শতকের পর্যটকদের মতো। কিন্তু চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে তাদের আলোচনা গড়হাজির ছিল। এসময় থেকেই হাসপাতালের ধারণায় কাঠামো ব্যাপারটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়। যা পরবর্তীতে আরও বিকশিত হয়। ফুকো এ থেকে সিদ্ধান্ত নেয়:

–        উনিশ শতকে হাসপাতাল ধারণায় স্থান প্রশ্ন বিশেষভাবে যুক্ত হয়। হাসপাতালের পরিবেশ কেমন হবে, কোথায় প্রতিষ্ঠিত হবে, অভ্যন্তরে কোথায় কি থাকবে ইত্যাদি। যা আধুনিক যন্ত্রপাতির সাথে সংশ্লিষ্ট।

–        হাসপাতালের সাথে শহরের সম্পর্ক তৈরি হয়। প্রতিটি জেলায় একটি করে হাসপাতাল থাকবে, শহরের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সব ব্যাপারগুলো হাসপাতালের তত্ত্বাবধানে থাকবে। বিশেষ করে শহরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা।

–        রোগীর রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে নথি ও দলিল লিপিবদ্ধ করা হয়। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন, ওষুধের তালিকা, রোগীর আচরণসহ বিশাল জনগোষ্ঠীর নানান তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ করা হয়। এর মাধ্যমে রোগীর উপর ডাক্তারের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

ফুকো এসব পয়েন্ট চিহ্নিত করে দেখান যে, আধুনিক হাসপাতাল প্রযুক্তি নির্ভর যা আঠারো শতকের শেষদিকে গোচর হয়। এর মাধ্যমে রোগীর চিকিৎসা পদ্ধতির উপর গুরুত্ব দেয়ার বদলে অবকাঠামোতে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। সাথেসাথে রোগীর নথি ও দলিল সংরক্ষণের মাধ্যমে রোগীর উপর ডাক্তারের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। মধ্যযুগে হাসপাতাল পরিচালনা করতো পাদ্রি, ডাক্তার মাঝেমধ্যে পরিদর্শন করতো, তা মাসে বা সপ্তাহে একবার। সেসময় ডাক্তারের ভূমিকা ছিল গৌণ, পাদ্রির ভূমিকা ছিল মুখ্য, পাদ্রি রোগীর যাবতীয় সিদ্ধান্ত নিত। আধুনিক সময়ে রোগীর যাবতীয় সিদ্ধান্তের ভার চলে আসে ডাক্তারদের হাতে। ডাক্তার এখন আর মাঝেমধ্যে হাসপাতাল পরিদর্শন করে না, চব্বিশ ঘন্টাই হাসপাতালে থাকে। 

৩.

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে মেডিসিন গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ। অস্ট্রিয়ান ধর্মতাত্ত্বিক ও দার্শনিক ইভান ইলিচ মেডিকেল নেমেসিস কিতাবে মেডিসিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ভয়াবহতা উল্লেখ করে মেডিসিন বিরোধী অবস্থান নেয়। জবাবে ফুকোর আলাপ মেডিসিনের পক্ষে বা মেডিসিন বিরোধিতায় নয়। মেডিসিন ঘিরে যে ব্যবস্থা আধুনিককালে গড়ে উঠেছে ফুকো সেই আলাপে বেশি আগ্রহী। জেনেটিক রুপান্তর, থেরাপির ভয়ংকর প্রতিক্রিয়া, বাড়তি ওষুধ প্রয়োগ, সংক্রামক রোগের চিকিৎসা, সার্জারিকেন্দ্রিক সমস্যাসহ যেসকল তালিকা পেশ করে ইলিচ আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে, ফুকো মনে করেন সেসব সমস্যা ডাক্তারদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা ঠিকঠাক থাকলে কমে যাবে। মেডিসিন মানুষকে বাঁচাতে পারে, সাথেসাথে মেরেও ফেলতে পারে। ফুকো মেডিসিন কেন্দ্রিক ৩টি বিষয় চিহ্নিত করেন-  জৈব-ইতিহাস রচনা, মেডিক্যালাইজেশন, মেডিসিনের রাজনৈতিক অর্থনীতি। এ তিনটি প্রক্রিয়ায় যা ঘটে, দেখা যাচ্ছে তা কোনোভাবেই মানুষের উপকারে আসেনা। এ প্রক্রিয়ায় মানুষের শরীর হয়ে যায় ব্যবসার কেন্দ্র আর মানুষের জৈব-ইতিহাস রচনা করা হয় সম্পূর্ণভাবে ব্যবসার প্রয়োজনে।  

ইউরোপে ফুকো তিনটি প্রক্রিয়ায় তিনটি দেশে সোশ্যাল মেডিসিনের বিকাশ দেখতে পেয়েছেন। আঠারো শতকের শুরুতে জার্মানিতে রাষ্ট্রীয় মেডিসিন– এর জন্ম হয়, এসময়ে জার্মানিতে বহুরকমের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা চলতে থাকে। ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মতো সে অর্থে জার্মানিতে বুর্জোয়া বিকাশ হয়নি কিন্তু আঠারো শতকের শুরুতেই সরকার স্বাস্থ্যব্যবস্থায় গুরুত্বারোপ করে স্বাস্থ্যশিক্ষা বিষয়ক ডিপ্লোমা কোর্স চালু করে, জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য বিষয়ক আদমশুমারি ও মহামারির  তথ্য সংগ্রহ করার ব্যবস্থা করে। বিভিন্ন অঞ্চলে হাসপাতাল তৈরির কাজ চলে, স্থানীয় রোগগুলোর উপর বিপুল পরিমানে তথ্য ও দলিল সংরক্ষণ করা হয়। এ সময় জার্মানিতে মেডিকাল জ্ঞান ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি পায় আর ফ্রান্সে মিলিটারি বৃদ্ধি পায় মিলিটারি জ্ঞান। আঠারো শতকের মাঝামাঝি ফ্রান্সে শহুরে মেডিসিন– এর জন্ম হয়। কুষ্ঠরোগ ও প্লেগ ফ্রান্সের শহরগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। তাই স্বভাবতই আধুনিক সময়ে এসে শহর ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন পড়ে। এসময় শহরের জনস্বাস্থ্য নিয়ে ব্যাপক শোরগোল সৃষ্টি হয়। শহরগুলোতে পানি ও বাতাসের স্বাভাবিক চলাচল, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং স্যানিটাইজেশনের উপর জোর দেয়া হয়; কসাইখানাগুলো শহরের একপ্রান্তে স্থানান্তর করা হয়, অপ্রয়োজনীয় বাড়িঘর ভেঙ্গে ফেলা হয় ও রাস্তাঘাটের নতুন মডেল বসে। নিত্য শহর পরিষ্কার ও দুর্গন্ধমুক্ত করতে ক্যামিকাল ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে যেহেতু ইংল্যান্ডের শহরগুলোতে শ্রমিক সংখ্যা অনেক বেশি পরিমানে ছিল, তাদের স্বাস্থ্য নিয়ে সরকারকে বিশেষ ভাবতে হয়। ম্যানচেস্টার বা ল্যাঙ্কাশায়ারের মতো শহরগুলোর ঘিঞ্জি পরিবেশ বহুরকম রোগের সৃষ্টি করেছিল। তন্মোধ্যে ডায়রিয়ার প্রকোপ অনেক বেশি ছিল। ফলে একদিকে শ্রমঘন্টা নষ্ট হত, অন্যদিকে এসব রোগ ছড়িয়ে পড়ে শহরের অভিজাতদের সমস্যায় ফেলতো। তাই পরিস্থিতির চাপে ইংল্যান্ডের সরকার শ্রমিক সহায়ক মেডিসিন -এর ধারণা চালু করে। 

এ তিন মেডিসিনের ধারণা পরবর্তীতে দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। উনিশ শতকে উপনিবেশগুলোতে এর ব্যবহার দেখা যায়। খ্রিস্টান মিশনারি ও প্রশাসকরা বহুল পরিমানে মেডিসিন ব্যবহার করে। তবে বিশ শতকে এর ভিন্নরূপ দেখা যায়।

৪.

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইংল্যান্ডের স্বাস্থ্যব্যবস্থ্যায় বেভারিজ পরিকল্পনা নেয়া হয়। বেভারিজ পরিকল্পনা স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কথা বলে ও স্বাস্থ্যবীমা ধারণার জন্ম দেয়। পাবলিক স্বাস্থ্যখাতকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করার পরিকল্পনা নেয়। উনিশ শতকে স্বাস্থ্যবিধি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছিলো, কিন্তু বিশ শতকের বেভারিজ পরিকল্পনায় সুস্বাস্থ্যের ধারণা গোচর হয়। ফুকোর মতে, এর মাধ্যমে রাষ্ট্র মানুষকে নিয়ন্ত্রণের দিকে মনোযোগ দেয়, আর রাষ্ট্র শুধু নিয়ন্ত্রণে মনোযোগী হয়েই থেমে থাকেনা নৈতিকতা আরোপ করে। এ থেকেই মাইক্রো অর্থনীতির জগতে প্রবেশ করে যা বিশাল রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ। বেভারিজ পরিকল্পনার মাধ্যমে নতুন শরীর, নতুন অধিকার, নতুন রাজনীতি, নতুন নৈতিকতা, নতুন অর্থনীতির জন্ম হয়। একই ব্যাপার উনিশ শতকের ভিক্টোরিয়ান সময়ে দেখা গিয়েছিলো। যেখানে সমকামীতাকে রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হত।

চিকিৎসা সেবায় হাসপাতাল কতৃপক্ষ রোগীর সাথে এক বিশেষ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে পড়ে। যেখানে রোগী নিজের রোগ সম্পর্কে নিজে সিদ্ধান্ত দিতে পারেনা। কতৃপক্ষই (নার্স-ডাক্তার-প্রশাসক) শুধু সিদ্ধান্ত দিতে পারে। কারণ চিকিৎসা বৈধ কতৃপক্ষ ছাড়া দেয়া সম্ভব নয়। আর চিকিৎসা দিতে গিয়ে তারা শুধু চিকিৎসাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনা বরং ফুকোর মতে, সামাজিক কতৃপক্ষের মতো আচরণ করে ও সিদ্ধান্ত দেয়। যেন মেডিকেল সায়েন্স শুধুই রকেট সায়েন্স। 

ফুকোর মতে, রোগ নিয়ন্ত্রণে মেডিসিন বিশেষ ভূমিকা রেখেছে, অ্যান্টিবায়োটিক রোগ প্রতিরোধে সক্ষম, মহামারিগুলোতে এর ব্যবহার কাজে লেগেছে। অনেকসময় এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে মেডিসিনের উন্নতি নজর কাড়ার মতো। একদিকে মেডিসিনের আধুনিক ফাংশন জনগোষ্ঠীকে জাতীয়করণ করতে সাহায্য করে, অন্যদিকে মেডিসিন ঘিরে গড়ে উঠেছে ফার্মাসিউটিক্যাল ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থা তৈরি করছে অনুগত ভোক্তাসমাজ; যারা প্রয়োজনে বা নিষ্প্রয়োজনে এ ব্যবস্থার সাথে জড়িত হয়ে পড়ে। একসময় রোমান ধর্মতত্ত্ব উপার্জন ও রাজনীতির চরম ক্ষেত্র ছিল। অসুস্থতা, সুস্থতা, বাণিজ্য ও রাজনীতি মিলে আধুনিক মেডিসিন ব্যবস্থা রোমান ধর্মতত্তে¡র মতোই ফাংশন করে। ফলে প্রযুক্তিগত উন্নতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতির দরুন মানুষ যে ধরণের স্বাস্থ্যসেবা চায়, তা পাওয়া সম্ভব হয়ে উঠেনা। ফুকোর মতে, এ সমস্যার উৎপত্তি আঠারো শতকে; যখন আধুনিক মেডিসিন ব্যবস্থা ইউরোপে গড়ে উঠছে। 

৫. 

মিশেল ফুকো আধুনিক হাসপাতাল ও মেডিসিন ব্যবস্থার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুটি দিককে বিশেষভাবে উন্মোচিত করেন। সাথেসাথে ব্যক্তি যে প্রক্রিয়ায় এক দানবীয় কাঠামোর খপ্পরে যাবতীয় স্বাধীনতা হারিয়ে বসে আছে, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ হাজির করেন। ফুকোর আলোচনায় ঔপনিবেশিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা একেবারেই অনুপস্থিত অথচ আধুনিক মেডিসিনের বড় ট্রায়ালগুলো উপনিবেশিতদের মধ্যে হয়েছে। মেডিসিন ছিল ঔপনিবেশের পক্ষে মতাদর্শ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। ফ্রাঞ্জ ফানোর এ্যা ডায়িং কলোনিয়ালিজম কিতাবে এ বিষয়ে আন্দাজ পাওয়া যায়। 

আধুনিক মেডিসিন যেসব জ্ঞান উৎপাদন করে, তা বেশিরভাগসময় স্থানীয় জ্ঞানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং বাস্তবতা এমন যে স্থানীয় জ্ঞানকে ‘আদারিং’ করে উৎখাত করে ছাড়ে। আর যেহেতু ব্যাপকভাবে বাণিজ্যিক স্বার্থ এরসাথে জড়িত আছে, স্বভাবতই আধুনিক মেডিসিনের প্রশ্নটি যেকোনোঅর্থে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বাংলাদেশ কোন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একে গ্রহণ করবে? এখানকার মেডিসিন ব্যবস্থা কীভাবে জ্ঞান উৎপাদন করবে? কীভাবে স্থানীয় ও জনমানুষের জ্ঞানের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করবে? চিকিৎসা নৃবিজ্ঞানী পল রিচার্ডস ইবোলা: হাউ এ্যা পিপল’স সায়েন্স হেল্প ইন্ড এ্যান এপিডেমিক কিতাবে মহামারি মোকাবেলায় জনমানুষের বিজ্ঞান কীভাবে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে তার ফিরিস্তি দিয়েছে। রিচার্ডসের মূল অভিযোগ ছিল আধুনিক মেডিসিনের বিরুদ্ধে; ইবোলা মোকাবেলায় আধুনিক মেডিসিন বুমেরাং হয়েছে। করোনা মোকাবেলায় জনমানুষের বিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যেমন শোনা যাচ্ছে, ঘন ঘন মাল্টার চা পান বা মেথি, লং, এলাচ, তেজপাতা মিশ্রিত গরম পানির ধোঁয়া করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির বেশ উপকারে আসে। ফুকোর আলাপে এসব জনমানুষের বিজ্ঞানের ইনসাইট আমরা পাইনা। বরং ফুকো আধুনিক মেডিসিনের ভিতরেই সমাধান খুঁজে পান।  

ভ্যাকসিন যদি হয় রকেট সায়েন্স, ভ্যাকসিনেশন সোশাল সায়েন্স। অতিসম্প্রতি করোনা ভ্যাকসিনের আলাপ আমরা যেভাবে শুনছি তাতে অনেকের আন্দাজ যে ভ্যাকসিন পেলেই দেশ থেকে করোনা চলে যাবে। তাই প্রিন্ট মিডিয়া কিংবা ব্রডকাস্ট মিডিয়া ও পাবলিক পরিসরে ভ্যাকসিন ক্রয়ের আলাপ হরদম চলছে। অথচ ভ্যাকসিনেশন যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার তা নিয়ে পাবলিক পরিসরে আলোচনা একদমই অনুপস্থিত। বাংলাদেশে ভ্যাকসিনেশনের গুরুত্ব যে একবারে কম বা নাই তা পাবলিক ট্রলে মন্ত্রীর ভ্যাকসিনেশনের ছবি পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দেয়। ফুকোর আলাপে ভালোভাবেই এসেছে মেডিকেল সায়েন্স রকেট সায়েন্স নয়, কিন্তু একে ঘিরে যে গল্পগুলো তৈরি হয় তাতে মনে হয় এটা আসলেই রকেট সায়েন্স।