সংগঠন পরিচিতি ও বক্তব্য:

২০০৫ সালের ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক শ্রমজীবি নারী দিবসে নারী সংহতি’র প্রতিষ্ঠা। ছাত্র রাজনীতি শেষে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের কজন প্রাক্তন নারী সদস্যের বিশেষ তাগিদ ও উদ্যোগে গড়ে উঠে নারীর জন্য স্বতন্ত্র সংগঠন নারী সংহতি । মানুষ ও নাগরিক হিসেবে নারীর অধিকার আদায় এবং নারী নিপীড়ন ও নারী-পুরুষের বৈষম্য প্রতিরোধকে প্রধান বিবেচনায় রেখে আমাদের যাত্রা। সমাজের অর্ধেক অংশ নারী ছাড়া সমাজ ও জাতি যেমন এগুতে পারে না, তেমনি নারীমুক্তি ও জাতীয়মুক্তির সংগ্রামও অগ্রসর হয় না। তাই সংগ্রাম-সংগঠনের সীমানা নির্ধারণে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিমÐল অতিক্রম অনিবার্য। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা মনে করি কেবল মধ্যবিত্ত নয় বরং অধিকাংশ শ্রমজীবি-মেহনতি-মজলুম নারীর যুক্ততাই পারে নারীর লড়াইকে সুনির্দিষ্টভাবে অগ্রসর করতে। পুঁজিবাদী-পুরুষতান্ত্রিক এই রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নারীর কর্তাসত্ত¡া ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে মাঠের ও আইনী লড়াই এবং মতাদর্শিক লড়াই উভয়ই করে আসছি আমরা। ঘরে-বাইরে নারীর উপর নিপীড়ন এবং বৈষম্যর বিরুদ্ধে ভিক্টিম আকারে নয় লড়াকু হিসাবে নারী শক্তির উপস্থিতি ও ঐক্য সংহত করার কাজে আমরা আগ্রহী ।

ছবিসূত্র:নারী সংহতি থেকে প্রাপ্ত


কাগজে কলমে বাংলাদেশের সংবিধানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সমঅধিকারের অঙ্গীকার থাকলেও মূলত পারিবারিক আইন থেকে শুরু করে পাঠ্যপুস্তক, মিডিয়াসহ সর্বত্র বিরাজ করছে বৈষম্য, নারীর পণ্যায়ন। সর্বোপরি পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে উপস্থাপন। যেখানে নারী পূর্ণাঙ্গ নাগরিকের বদলে হাজির হয় হেয় প্রতিপন্ন রূপে। সমাজে পর্যাপ্ত ডে-কেয়ার, জাতীয় রন্ধন শালা-লন্ড্রী, মাতৃত্বকালীন ছুটির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনায় শিশু লালন-পালন এবং গার্হস্থ্য শ্রমের ঘানি এককভাবে নারীর কাঁধে চেপে আছে। একদিকে নাগরিক হিসাবে অধিকারহীনতা; পরিচয়ের সংকট; নারী-পুরুষ সম্পর্কের নানা মানসিক জটিলতা ও চাপ অন্যদিকে গার্হস্থ্য ঘানি নারীর জীবনে দুদÐ অবসর প্রাপ্তির সমস্ত সুযোগ কেড়ে নেয়। এই অবসরের অভাব নারীর সৃজনশীল কর্তা সত্ত¡া তৈরীর পথে বিরাট অন্তরায়। অন্যান্য লড়াইয়ের সঙ্গে নারীর সৃজনশীল কর্তাসত্ত¡া প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে পাড়া মহল্লা এবং কল-কারখানাসহ সকল প্রতিষ্ঠানে যথাযথ ডে-কেয়ার প্রতিষ্ঠার দাবিকে অন্যতম করেছে নারী সংহতি। নারীর অবসরপ্রাপ্তির সুযোগ নারী আন্দোলন ও রাজনৈতিক আন্দোলন উভয়ের জন্য জরুরি। তাই সমাজে ইতিহাসে নাগরিক হিসাবে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণের জন্য নারীর অবসর ও কর্তা সত্ত¡ার লড়াই অনস্বীকার্য। এজন্য নারীকে তার ব্যক্তিগত জীবনের পরিসর থেকে জনপরিসর সর্বত্র লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে আহŸান করি আমরা।
এ অবস্থায় স্বল্প মেয়াদে বিচারহীনতার বিরূদ্ধে, অপরাধীর শাস্তির দাবিতে এবং বিভিন্ন আইনি সংস্কার ও পরিবর্তনে আন্দোলন জারি রেখেছি । একইসাথে অনুধাবন করছি দীর্ঘ মেয়াদে সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের অপরিসীম গুরুত্ব। এ কারণেই মিছিল-সভা-সমাবেশ-বিক্ষোভ-প্রতিরোধ ইত্যাদির মাধ্যমে চাপপ্রয়োগকারী শক্তি হয়ে থাকার সাথে সাথে জারি আছে মতাদর্শিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রাম। নিয়মিত পাঠচক্র ও উন্মুক্ত আলোচনা, নারী আন্দোলন সংগ্রাম বিষয়ে বিশেষ প্রকাশনা ‘মুক্তস্বর’ তারই অংশ ।


শুরু থেকেই নারী-পুরুষের সম-অধিকারের দাবিতে এবং ধর্ষণ-যৌন নিপীড়নসহ নারীর উপর সংঘটিত সকল নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছি আমরা। পাহাড়ে-সমতলে সর্বত্র নারীর উপর জাতিগত-ধর্মীয়-বর্র্ণীয়-লিঙ্গীয় সকল নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সমানতালে লড়াইয়ের প্রশ্নকে আমরা জোর দিতে চাই। রাষ্ট্রীয় সকল অধিকার-সুযোগে ও সম্পত্তিতে নারী পুরুষের সমানাধিকারের দাবিতে এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে পাড়া-মহল্লা; পথে-পরিবহনে; শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার দাবিতে নানান কর্মসূচি পালন করে আসছে নারী সংহতি। এর ধারাবাহিকতায় ঐক্যবদ্ধ নারী আন্দোলনে উপস্থিত হয় সমঅধিকার আমাদের ন্যুনতম দাবি এবং যৌন নিপীড়ন বিরোধী নীতিমালা ও অভিযোগসেলের দাবি।


সকলেরই জানা, যে কোন অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় নারীর উপর নিপীড়নের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। তাই নারীমুক্তির লড়াইয়ে সমাজের বিচারহীনতা-গণতন্ত্রহীনতা; ভয় ও লুটপাট কেন্দ্রিক অর্থনীতি ও সংস্কৃতির অঙ্গাঅঙ্গি সম্পর্ককে চিহ্নিত করেই লড়াই জারি রাখতে চাই আমরা। সকল প্রগতিশীল নারী সংগঠনের শক্তির বন্ধনে ঐক্যবদ্ধ নারী আন্দোলন গড়ে তুলতে চাই আমরা। নিজেদের অর্জন- অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে এবং সীমাবদ্ধতা ও ত্রæটি থেকে শিখে এগুতে আমরা বদ্ধপরিকর।