নারীর প্রতি সকল বৈষম্য বিলোপ, সমানাধিকারের দাবি ও শোষণ মুক্তির চেতনায় ২০১৩ সালে ২৭ জুলাই বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্রের যাত্রা শুরু। দেশের অর্ধেক অংশ নারী হলেও মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি এ পুঁজিবাদী সমাজে নেই। কারণ, পুঁজিবাদ ভোগবাদী সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক। এর অংশ হিসেবে সে নারীদেহকে পণ্যায়ন করে।পাশাপাশি পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে নারীর প্রতি অধঃস্তন দৃষ্টিভঙ্গি গণতান্ত্রিক মননকাঠামো গড়ে ওঠবার পথে অন্তরায়।


অথচ ফরাসী বিপ্লবে নারী স্বাধীনতার বিষয়টি উচ্চারিত হয়েছিল। সেই সময় বড় বাঁধা ছিল সামন্ত মনন কাঠামোর দাস্যবৃত্তি ও পুরুষতান্ত্রিক মননের অধীনতা। পুঁজিবাদ নারীকে মুক্ত করেনি বরং পুরুষতান্ত্রিক মনন ও ভোগবাদিতা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সবাইকে আক্রান্ত করেছে। ফলে সমাজে নারী শিক্ষার হার, নানা ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও তাকে অধঃস্তন ভাবা, ক্ষমতা প্রয়োগ ও সহিংসতার বীজ সমাজ অভ্যন্তর থেকে নির্মূল হয়ে যায়নি। বরং নারীর অধিকার ও মানবাধিকারের মধ্যকার দূরত্ব বাড়তে বাড়তে অনেকটা বিপরীত অবস্থানে পৌঁছেছে।


বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্র সম্মান-মর্যাদা ও শোষণ নিপীড়নমুক্ত মানবিক সমাজে বিশ্বাসী। তাই সকল অন্যায়, নারীর প্রতি বৈষম্য ও ভোগবাদিতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সংগ্রামরত। এ লড়াই নারীর একার নয়, নারীÑপুরুষ উভয়ের। তবে প্রথমত নারীদের নিজের মনের ও বাইরের শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে আসার লড়াই করতে হবে। লড়াইয়ের হাতিয়ার দু’টি, জ্ঞান ও একতা।


নারীমুক্তি কেন্দ্র অতীত দিনের সমস্ত বড় মানুষের সংগ্রামের প্রতি দায়বদ্ধ। আজ এ পুঁজিবাদী সমাজে নারীকে মুক্ত করার সংগ্রামের সাথে শোষণমূলক ব্যবস্থা পাল্টানোর সংগ্রাম যুক্ত। তাই শোষণমুক্তির চেতনায় এই গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আমরা সবাইকে যুক্ত হবার আহŸান জানাই।

দাবিনামা


১.সমাজের সর্বক্ষেত্রে নারীÑপুরুষের সমানাধিকার নিশ্চিত কর। ইউনিফরম সিভিল কোড চালু কর। আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দাও। সিডও সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন চাই।
২.নারীদের পারিবারিক ও গৃহস্থালী কাজকে উৎপাদনশীল কাজ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এই শ্রমের মূল্য নির্ধারণ কর।
৩. পাহাড়-সমতলে ধর্ষণ ও সহিংসতারোধে ধর্ষকদের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত কর। আক্রান্ত ব্যক্তি ও পরিবারের সামাজিক নিরাপত্তা এবং আইনগত সহযোগিতা নিশ্চিত কর।
৪. সমকাজে সমমজুরি নিশ্চিত কর। গার্মেন্টস সেক্টরসহ সকল সেক্টরের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১৬০০০ টাকা আইনসহ ঘোষণা কর। সকল শ্রমিকদের নিয়োগপত্র ও অবসরভাতা চাই। গার্মেন্টসে ট্রেডইউনিয়ন অধিকার চাই।
৫. বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ এর বিশেষ ধারা বাতিল কর। বাল্যবিবাহ রোধে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি গড়ে তোল। যৌতুক বন্ধে আইনগত ব্যবস্থা জোরদার কর। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শরীরচর্চা, খেলাধূলা ও আত্মরক্ষামূলক কোর্স আবশ্যিক করতে হবে। সকল প্রতিষ্ঠানে নারী নিপীড়ন বিরোধী সেল গঠন ও কার্যকর কর।
৬. শ্রমজীবী-কর্মজীবী নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি কার্যকর ও ভাতা দাও। কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ নারীবান্ধব নিশ্চিত কর ও শিশু পরিচর্যার জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার চালু কর। কর্মজীবীদের জন্য সরকারি হোস্টেলের সংখ্যা বৃদ্ধি কর। শ্রমঘন এলাকায় কর্মক্ষেত্রের কাছে শ্রমিক কলোনি নির্মাণ করে শ্রমিকদের বরাদ্দ দাও।
৭. অপসংস্কৃতি রোধ কর। পর্নোসাইট বন্ধ, জুয়া ও মাদক বন্ধে আইন কার্যকর কর। ধর্মীয় সভা, সভা-সমাবেশ, বিবৃতি ও পাঠ্য বইয়ে নারীকে হেয় করা ও বৈষম্যমূলক বক্তব্য প্রদানকারীদের প্রতি আইনগত ব্যবস্থা চাই। নাটক-সিনেমা-বিজ্ঞাপনে নারীকে পণ্য করা চলবে না।
৮. উপজেলা পর্যায়ে মাতৃসদনে আসন সংখ্যা বৃদ্ধি কর। প্রসূতি মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত ডাক্তার, নার্স নিয়োগ কর। নার্সদের নিয়মিত নিয়োগ ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত কর।
৯. গৃহকর্মীদের ন্যায্য বেতন, সাপ্তাহিক ছুটি ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত কর। তাদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে শ্রম আইনের আওতায় আনতে হবে। প্রবাসে জনশক্তি রপ্তানিতে নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মজুরি নিশ্চিত না করে শ্রমিক পাঠানো চলবেনা। সৌদিআরব সহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নারী শ্রমিক খুনের বিচার ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত কর।
১০. অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের জীবনগাঁথা পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভূক্ত কর। পাঠ্যপুস্তকে ৫২, ৬২, ৬৯ সহ মুক্তিযুদ্ধের বস্তুনিষ্ঠ সঠিক ইতিহাস অন্তর্ভূক্ত কর। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী নারীদের স্বীকৃতি ও সনদ প্রদান কর। সকল দুঃস্থ মানুষকে বার্ধক্য ভাতা, বেকার ভাতা দাও।