সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম (Socialist Women’s Forum-Women’s Forum) একটি প্রগতিশীল নারী সংগঠন। ১৯৮৪ সালের ৫ জানুয়ারি এই সংগঠনটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই সংগঠন মনে করে নারী এবং পুরুষ মিলে যে সমাজ তার কোন একটি অংশকে বাদ দিয়ে সভ্যতা অর্জন করা কিংবা রক্ষা করা কোনটাই সম্ভব নয়। কারণ সভ্যতা বলতে আমরা বুঝি মানব সভ্যতা। পুরুষ সভ্যতা কিংবা নারী সভ্যতা – এভাবে সভ্যতার বিচার হয় না। বাংলাদেশে নারী এবং পুরুষের মধ্যে পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, প্রথা-সংস্কার, শাসন-প্রশাসন, আইন-কানুন, বিধি-বিধানসহ সর্বক্ষেত্রে যে বৈষম্য রয়েছে তা গণতন্ত্র, মানবতা ও সভ্যতাকে কলঙ্কিত ও অসম্পূর্ণ করে রেখেছে। এতে অসভ্যতা ও বর্বরতার বহু উপাদান চতুর্দিক থেকে আমাদের গ্রাস করে চলেছে। তার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রভাবে একদিকে ঘটে চলেছে অবর্ণনীয় নারী নির্যাতন-নিপীড়ন অন্যদিকে অবিশ্বাস্য মাত্রায় পুরুষদের  ঘটছে চারিত্রিক-নৈতিক অধঃপতন। অথচ কি বিশাল প্রতিশ্রুতি ছিল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে। সেদিন অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী সমাজ শুধু নির্যাতনই সহ্য করেনি, পুরুষদের পাশাপাশি প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সংগ্রামের এক বিরোচিত অধ্যায়ও রচনা করেছিল। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে হাজার হাজার নারীদের রাজপথ কাঁপানো ডামি রাইফেল উঁচিয়ে শত্রু মোকাবেলার সদম্ভ প্রস্তুতিমূলক মিছিলের ছবি আজও আমাদের প্রেরণা জোগায়। এই স্মৃতি যুগ যুগ ধরে আমাদের নারী সমাজের শৌর্যের মূর্তি ও সংগ্রামের বীরগাঁথা প্রকাশ করে যাবে। আমাদের পূর্বসূরী নারী, নারী জাগৃতি আন্দোলন ও জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের দুই উজ্জ্বল তারকা, বেগম রোকেয়া ও প্রীতিলতা। একজন রামমোহন-বিদ্যাসাগর রচিত নবজাগরণ (রেনেস্যাঁ) আন্দোলনের উত্তরসূরী মুসলিম সমাজে আলোড়ন সৃষ্টিকারী, নারী জাগৃতির পথিকৃৎ নবজাগরণের পতাকাবাহী বেগম রোকেয়া (১৮৮০-১৯৩২) অন্যজন বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের অন্যতম নেতৃত্বদানকারী বীর শহীদ প্রীতিলতা(১৯১১-১৯৩২)। দু’জনেই আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের রংপুর ও চট্টগ্রামের সন্তান, সগৌরবে মহীয়ান। আমরা তাদের উত্তরসূরী, তাদের শিক্ষা, সংগ্রাম আমাদের প্রেরণা, আমাদের গর্ব। অথচ স্বাধীনতার ৪০ বছর পর আমরা কোন প্রত্যাশার কি পরিণতিতে এসে দাঁড়ালাম? পাকিস্তানী হানাদারদের দ্বারা দুই লক্ষ মা-বোনের নির্যাতনের কথা বলতে বলতেই স্বাধীন দেশে ২০ লক্ষাধিক নারী লোমহর্ষক নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছে। লক্ষ লক্ষ নারী বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। কিশোর বয়সী ছেলেদের নাম হয়েছে বখাটে আর তাদের উপদ্রবে তাদের বোন কিশোরীরা আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে। যৌতুকের বলী, গণধর্ষণের শিকার সহ ঘরে বাইরে নানা উৎপীড়ন, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে উৎকণ্ঠার বাইরে কোন নারীর পক্ষে স্বাভাবিক জীবন যাপন কল্পনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কেন এমন হলো এবং কি এর প্রতিকার? জনমানুষ এবং নারী সমাজের এই প্রশ্নকে সামনে রেখেই সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের আত্মপ্রকাশ। 

মহিলা ফোরামের ঘোষণা: 

সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম ইতিহাসের শিক্ষা নিয়ে এই ধারণা তুলে ধরেছে যে মানুষের সমাজ গঠনের শুরু থেকেই নারী-পুরুষের এই বৈষম্য চিত্র ছিল না। নারী পুরুষের পার্থক্য প্রাকৃতিক। পার্থক্য এবং বৈষম্য এক জিনিস নয়। সেজন্য প্রকৃতি বৈচিত্রে ভরপুর। কেউ তাকে বৈষম্যে বা অধীনতায় ভরপুর বলে না। আদিম গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজে বরং নারীরাই সমাজের কেন্দ্র বিন্দুতে ছিল। কিন্তু সমাজ শ্রেণী বিভক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় নারী পুরুষের অধীনস্ত হয়; সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ শোষণের শিকার দাসে এবং সংখ্যালঘিষ্টরা শোষক মালিকে পরিণত হয়। এইভাবে দাস ব্যবস্থা সামন্তব্যবস্থা অতিক্রম করে পুঁজিবাদী সমাজ চলতে চলতে সাম্রাজ্যবাদী স্তরে উপণীত হয়েছে। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের উদ্ভাবক মনীষী কার্ল মার্কস ও তার সহযোগি ফেড্রারিখ এঙ্গেলস দেখিয়েছেন কিভাবে আদিম গোষ্ঠী সমাজের সামাজিক সম্পত্তির উপর শ্রেণী বিভক্ত সমাজে ব্যক্তিমালিকানা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় শোষণ ও বৈষম্য তৈরি হয়েছে, নারীরা পুরুষের সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে, অধীনস্ত হয়েছে। আদিম সাম্য সমাজ পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পরিণতি লাভ করেছে। তা চলছে এবং চলতে থাকবে যতদিন শ্রেণী বৈষম্যের বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজতন্ত্রের পথে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা করা না যায়। সেজন্য সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম নারী মুক্তি আন্দোলনকে সমাজের আমূল পরিবর্তনের সংগ্রামের সাথে যুক্ত করে দেখে। এটাই ইতিহাসের বিজ্ঞানসম্মত রায় বলে আমরা মনে করি। 

উদ্দেশ্য ও আদর্শ: 

বাংলাদেশে প্রতিদিন নারী নির্যাতনের অসংখ্য খবর পত্রিকার পাতায় ভেসে উঠে, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের মনকে পীড়িত করে কিন্তু পাশাপাশি অর্ধেক জনসংখ্যা নারী সমাজের পক্ষ থেকে শক্তিশালী প্রতিরোধের তেমন চিত্র প্রকাশ পায়না। সেজন্য অধঃপতিত শক্তির আক্রমণ বেড়ে চলে। সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম জনমনে এবং নারী সমাজের মাঝে সে আশা জাগানিয়া প্রতিরোধের শক্তি হিসাবে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। দেশের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা, সমর্থন ও উৎসাহের পাশাপাশি সংগ্রামী চেতনা নিয়ে মহিলা ফোরামে নারীদের অংশগ্রহণ যত বাড়তে থাকবে ততই ‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন’ সম্ভব এ প্রত্যয় ও বিশ্বাস যেমন জাগাবে তেমনি সমাজপ্রগতি তথা সভ্যতা বিকাশের সংগ্রামও এগিয়ে যাবে। নারী জাগৃতি, নারী মুক্তির লক্ষ্যে নারী-পুরুষের মিলিত সংগ্রাম এই সংগঠনের প্রতিশ্রুতি। এই সংগঠন সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা ও তাদের আগ্রাসন, লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে দেশে দেশে স্বাধীনতাকামী, প্রগতিবাদী মানুষের অধিকার আদায় ও শোষণমুক্তির লড়াইয়ের পক্ষে সোচ্চার হবে ও সমর্থন জানাবে। শোষিত শ্রেণীভুক্ত সকল অংশের মানুষের অধিকার আদায় ও শোষণমুক্তির লড়াইয়ে সামিল হবে। এই সংগঠন যেখানেই নারীর উপর নির্যাতন-নিপীড়ন হবে সেখানেই তাদের পাশে দাঁড়াবে এবং প্রতিরোধ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। এই সংগঠন নারী সমাজের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি ও সংগ্রামী শক্তির বিকাশ সাধনে তৎপর থাকবে। এই সংগঠন নিজস্ব সাংগঠনিক উদ্যোগের পাশাপাশি অপরাপর নারী সংগঠনসমূহের সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা ও নির্যাতন প্রতিরোধে ভূমিকা পালন করবে। এই সংগঠন নারী মুক্তি ও নারী অধিকার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক পরিসরেও আন্দোলনের সাথে সংহতি জ্ঞাপন করবে। এই সংগঠন নির্যাতিত-নিপীড়িত, অধিকার বঞ্চিত নারীদের পাশে দাঁড়িয়ে সাধ্য-সামর্থমত সার্বিক সহযোগিতা প্রদানের চেষ্টা চালাবে। এই সংগঠন প্রাতিষ্ঠানিক নারী শিক্ষার বিস্তৃতি ও সকল সাংগঠনিক স্তরে পাঠাগার আন্দোলন স্বতন্ত্রভাবে এবং যৌথভাবে করতে উদ্যোগী হবে। সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম তার উদ্দেশ্য-আদর্শ ও লক্ষ্যের পরিপূরক রাজনৈতিক দল ও শক্তির সাথে সম্পর্কিত থাকবে।

অতীত ভূমিকা

আত্মপ্রকাশের পর থেকেই সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম স্বৈরাচার-সাম্প্রদায়িকতা অশ্লীলতা-অপসংস্কৃতি, নারীর প্রতি সকল ধরনের বৈষম্য-নির্যাতন এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছে। দিনাজপুরের ইয়াসমিন, গাইবান্ধার তৃষা, চট্টগ্রামের সীমা, কুমিল্লার তনু , ফেনীর নুসরাত,  ইভটিজিং এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে মিজানুর রশীদ ও চাপা রাণী ভৌমিক হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশসহ সকল ধর্ষণ, নারী-শিশু হত্যা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগঠিত করেছে, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জাতীয় কনভেনশন অনুষ্ঠিত করেছে। বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন এর ১৯ নং ধারা (বিশেষ পরিস্থিতিতে বাবা মায়ের বা আদালতের সম্মতিতে বিবাহের বিধান) বাতিলের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তুলেছে । শিশু খাদ্য, দুধে মেলামাইন ও খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। গণআদালতে ও গণজাগরণ মঞ্চে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন সংগঠিত করা, সাম্প্রদায়িক শক্তির পরামর্শে পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন আনার বিরুদ্ধে,  ফতোয়া বাজির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা, অশ্লীলতা-অপসংস্কৃতি -ইভটিজিং বন্ধ করা ও অপরাধিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলাসহ জাতীয় নানা ইস্যুতেও আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে। দেশের বন্দর, গ্যাস, নদী, সুন্দরবন তথা প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার দাবিতে লং মার্চের মত কর্মসূচিতেও সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম অংশগ্রহণ করেছে। বেগম রোকেয়া, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, জাহানারা ইমাম, ইলা মিত্রসহ অতীত দিনের সংগ্রামী নারী নেতৃদের জীবন সংগ্রাম থেকে শিক্ষা গ্রহণের লক্ষ্যে দেশব্যাপী তাদের স্মরণ সভা করার মাধ্যমে মর্যাদাপূর্ণ জীবন গড়তে নারী সমাজকে উদ্বুদ্ধ করছে। সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম মনে করে শুধু অধিকারের কথা বলাই যথেষ্ট নয়, সমাজ সচেতনতা বিকাশ, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ সংগ্রামের পথেই সত্যিকার মর্যাদা ও অধিকার আদায় সম্ভব। এ পথেই সার্বিক মুক্তি একদিন অর্জিত হবে।