ঘরে-বাইরে-কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত কর
সমমর্যাদা ও মত প্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে বেগবান করুন

আজ বিকাল ৪টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্রের উদ্যোগে ঘরে বাইরে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং সমমর্যাদা ও মত প্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবি নিয়ে সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রীয় সভাপতি সীমা দত্তের সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও ঢাকা নগরের সভাপতি তসলিমা আক্তার বিউটি, কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক ও ঢাকা নগরের সদস্য সচিব তৌফিকা লিজা এবং ঢাকা নগর কমিটির সদস্য নাজনিন আক্তার শারমিন।


সমাবেশে বক্তারা বলেন, ৮ মার্চের ইতিহাসের সাথে সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নাম এবং সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন যুক্ত। কিন্তু আজ আমরা দেখছি ক্লারা জেটকিন কিংবা সমাজতন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে, সংগ্রামী তেজকে ম্লান করে দিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে নারী দিবস পালন করা হচ্ছে। অথচ ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে দেশে দেশে নারীদের সমানাধিকার এবং ভোটাধিকারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে ২য় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ক্লারা জেটকিন প্রতি বছর আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। স্থির হয় মার্চ মাসের যে কোন একদিন দিবসটি পালন করা হবে। তার ভিত্তিতে অস্ট্রীয়া, ডেনমার্ক, জার্মান এবং সুইজারল্যান্ডের সমাজতান্ত্রিক নারী সংগঠনগুলির উদ্যোগে ১৯১১ সালের ১৯ মার্চ প্রথম আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করা হয়। পরবর্তীতে নিরাপদ কর্মপরিবেশ, মজুরী বৃদ্ধি এবং কাজের ঘন্টা কমানোর দাবিতে ১৯০৮ সালের ৮ মার্চ নিউইয়র্কে দর্জি নারী শ্রমিকরা যে সফল ধর্মঘট করে তাকে স্বীকৃতি দিয়ে ১৯১৪ সালে কোপেনহেগেনের ৩য় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে নির্দিষ্টভাবে শ্রমজীবি নারীর ‘সমানাধিকারের দাবি দিবস’ হিসাবে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।


বক্তারা আরো বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে এবারের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ঠিক করা হয়েছে ‘করোনাকালে নারী নেতৃত্ব, গড়বে নতুন সমতার বিশ্ব’। অথচ করোনাকালে আমরা দেখেছি শ্রমজীবি নারীসহ সকল শ্রেণী পেশার নারীদের কি ভয়াবহ দুঃসময় পার করতে হয়েছে। কাজ হারানো; আয় কমে যাওয়া; কাজের অনিশ্চয়তা; পারিবারিক সহিংসতা, ধর্ষণ-গণধর্ষণ, নারী নিপীড়ন বৃদ্ধি পাওয়া; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় নিরাপত্তাহীনতা এবং আর্থিক টানাপোড়নের কারনে বাল্যবিবাহ বেড়ে যাওয়া; ধর্মীয় সভাগুলিতে নারীদের নিয়ে নানা প্রকার আপত্তিকর বক্তব্য রাখা ইত্যাদি নানা ঘটনা প্রমাণ করে এই করোনাকালে বা তার পরবর্তী সময়ে নারী সবচেয়ে বেশী প্রতিকুল পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছে। এই সময়ে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে যে সকল ন্যুনতম পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তার সুফল মুষ্টিমেয় প্রভাবশালী নারীরা পেলেও দরিদ্র নারীরা দরিদ্রই থেকে গিয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে নারী তার আপন শক্তিতে বিকল্প কাজের চেষ্টা করেছে।

এমনি এক পরিস্থিতিতে দেশের ২৫টি পাটকল ও ৬টি চিনিকল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এইসকল কলের শ্রমিক কর্মচারীদের নারী শিশুরা কিভাবে দিনযাপন করবে তার কোন ভাবনা সরকারের নেই। পাহাড় এবং সমতলের আদিবাসীদের বসতভুমি দখল করে চলছে ব্যবসা বাণিজ্য। পার্বত্য চট্টগ্রামে নারী শিশুরা নানাভাবে নিপীড়ণের শিকার হচ্ছে। নানা প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে বিপথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে নারীদের গৃহশ্রমিকের নামে দাস ব্যবসায় পাঠানো হচ্ছে। সেখান থেকে তারা লাশ হয়ে ফিরছে। সরকার দলীয় যুবলীগনেতা কর্তৃক নোয়াখালীতে গৃহবধুকে বিবস্ত্র করে শ্লীলতাহানীর ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার অপরাধের চাইতে বড় অপরাধ সরকারের জনবিরোধী নীতির সমালোচনা করা। সরকার জনরোষ, গণআন্দোলনকে দমন করার জন্য একদিকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নামক কালো আইন দিয়ে ব্রিটিশ পাকিস্তানীদের চাইতেও জঘন্যভাবে মুক্তবুদ্ধি মুক্ত চিন্তার দ্বার রুদ্ধ করছে, অন্যদিকে প্রশাসনিক ও দলীয় পেটোয়াবাহিনী দিয়ে নানাভাবে দমন করছে।


মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পর মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদানকারী দল আওয়ামী লীগ পাকিস্তানী শোষকের ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে বড় বড় কর্পোরেট পুঁজির মালিকদের সন্তুষ্ট রাখতে হবে। কারণ সারাবিশ্ব আজ পরিচালনা করছে এই মালিকরাই। আর তাই লুটপাট-দুর্নীতি-টাকা পাচার নির্বিঘেœ করতে হলে সরকারের দরকার একদল চরিত্রহীন, মেরুদ-হীন দাস যারা হুকুমের গোলাম হয়ে কাজ করবে। আর সাধারণ মানুষ যাতে ভয়ে কোন প্রতিবাদ না করতে পারে তার জন্য ভোগবাদী- স্বার্থপর মানসিকতা তৈরির নানা আয়োজনকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।


নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদ উচ্ছেদ না হলে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা দূর হবে না। সমাজ থেকে বৈষম্য দূর হবে না। তাই আজ নারী দিবসের যথার্থতা তুলে ধরতে হলে নারী আন্দোলনকে সমাজ পরিবর্তনের পরিপুরক আন্দোলনের লক্ষে পরিচালিত করতে হবে। বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্র এ আন্দোলনকে শক্তিশালী করার জন্য সর্বস্তরের জনগণের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে।