আমার অজপাড়াগাঁয়ের প্রাইমারি স্কুলের নারী সহপাঠীরা বিয়ে বেছে নিতে বাধ্য হলেও আমি বেছে নিলাম হাইস্কুল।হাইস্কুলের সহপাঠীরাও তাই করলো,আমি বেছে নিলাম কলেজ।সেই থেকে শুরু! আর থামিনি।যেহেতু পারিবারিক সিদ্ধান্তের বাইরে কাজ করা শুরু করলাম তাই নিজের খরচ নিজেই যোগাড় করতে হলো।মনে পড়ে প্রাইমারি বৃত্তির টাকা দিয়ে ছাগল কিনেছিলাম।আর ক্লাস 6 এ থাকা অবস্থায় প্রথম টিউশনি শুরু করলাম,সেটা অবশ্য বেশিদিন করিনি।
কলেজ শুরু হলো শহরে।নতুন পরিবেশ,নতুন চেহারা!যেহেতু ওইটুকুন বয়সে বিয়ে মেনে নিইনি তাই পড়াশুনার খরচ চালানোর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে হলো।কারন মেয়েদের ক্যারিয়ারের পিছনে অভিভাবকরা তখন টাকা ইনভেস্ট করার কথা কল্পনাও করেনি।আমাদের তখনকার সামাজিক পরিস্থিতিতে বিয়েই ছিলো মেয়েদের একমাত্র কযারিয়ার! টিউশনি,কিন্ডারগার্ডেনে শিক্ষকতা, কোচিংসেন্টারে পড়ানো,কম খেয়ে টাকা সেভ করা,ছাত্রী হোস্টেল বা মেস থেকে হেঁটে হেঁটে সব জায়গায় যাওয়া এবং বাড়ী থেকে পাওয়া ৫০০টাকা ও চাল, মাঝেসাঝে ১হাজার টাকা দিয়ে কলেজ জীবন পার হলো।আর অন্যান্য সমস্যার কথা এই লেখায় বাদ দিচ্ছি।শুধু আর্থিক ও পেশাগত গল্প করি।
আমার ২বছরের ছোটবোন ততদিনে স্কুল পাশ করেছে।এবার ও কি করবে? পারিবারিক সেই প্রাচীন সিদ্ধান্তে সম্মতি দিবে? আমি মানতে পারিনি।ওকেও শহরের কলেজে নিয়ে ভর্তির জন্য যুদ্ধ করে দুইবোন ময়মনসিংহ শহরে জীবনের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকলাম।তখন অবশ্য আমার মা লুকিয়ে অল্প টাকাপয়সা দিতেন আর আমার কাকা মানসিক সাপোর্ট।আমার বাবা আমাদের পড়াশুনার বিপক্ষে ছিলো।তার সব ভাবনা ছিলো তার ছেলেদের কেন্দ্রিক।এসব টানাপোড়েনের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় শেষ হলো।আর আমরা আমাদের একাগ্র ধৈর্য্য ও হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে এগিয়ে যেতে থাকলাম।আমাদের গ্রামে এখন অব্দি আমরা দুইবোনই মাস্টার্স কমপ্লিট করেছি,সে রেকর্ড আজ অব্দি কেউ ভাঙতে পারেনি।
আমি কোনদিন চাকরির ইন্টারভিউ দেইনি।অভিনয় করতে ঢাকা আসবো বলে একটা টিউশনির ২মাসের জমানো ৪হাজার টাকা নিয়ে যাত্রা শুরু।ফটোজেনিক কন্টেস্টের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে পাওয়া ১০হাজার টাকাও সাথে ছিলো।এরমধ্যে অনন্ত হীরা পরিচালিত ‘স্বপ্নের পাঠশালা’ মেগা সিরিয়ালে কাজ পেলাম যেখানে পার ডে ২০০০টাকা চুক্তিতে মাসে প্রায় ১০/১২ দিন শুটিং করতাম।আয়না ছবির অল্প টাকা পুরান ঢাকায় কাকুর বাসা থেকে বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াত করতেই শেষ হয়ে গিয়েছিলো।শুরুর দিকের অনিয়মিত খাওয়া এবং না খাওয়া থেকে আলসার হয়েছিলো।কারন বাইরে বের হতেই হতো কাজের জন্য,নতুন অবস্থায় সবার সাথে যোগাযোগ,পরিচিতির জন্য।কিন্তু খাবার কেনার টাকা বা একবোতল পানি কিনে খাওয়ার টাকা তখন ছিলোনা।আর মিডিয়া বেঁচে নিয়েছি বলে কোন পারিবারিক সাপোর্টও ছিলোনা।এরমধ্যেই আরেকটা মেগাসিরিয়াল,আরো সিরিয়াল… সিঙ্গেল … সিনেমা… একসময় প্রতিদিন শুটিং….. আর পিছনে তাকাইনি।নিজেকে ভালোভাবেই ভরনপোষন করতে পারছিলাম।তবে সেই যাত্রা ছিলো ভয়ংকর…ভয়ংকর কস্টের! বেঁচে গিয়েছিলাম শুধু স্বপ্ন আর জেদ আর পরিশ্রমের জোরে!
নতুন অবস্থায় নায়িকাদের নিয়ে নানান কথার কানাঘুষা কানে আসতো,পাত্তা দেইনি কখনো।এমন মিথ্যা,জটিলতার জগৎ,এমন অসম্মান আর আন্ডাররেটেড করার টেনডেন্সি চারদিকে, আমি হাবুডুবু খেয়ে যেতাম।কিন্তু গা ভাসাইনি কখনো।ভেতরে ভেতরে খারাপ লাগতো খুব।মাঝে মাঝে একা বাসায় কান্নায় ভেঙ্গে পরতাম।শিল্পী হিসেবে জীবনে কোন শিল্পপতির সাথে পরিচয় ঘটেনি,কোন প্রযোজক-পরিচালকের কাছে নিজেকে বিকোইনি।আমার গ্রামীন মন কোন কম্প্রোমাইজ,অসততা শিখেনি তাই স্ট্রাগলটা করতে হয়েছিলো অনেক অনেক বেশী!
এমন পরিস্হিতিত বেড়ে ওঠার কারনে কিনা জানিনা, আমার মধ্যে কোন শখ,বিলাসিতা বা ন্যাকামি গ্রো করতে পারেনি।বরাবরই ছিলাম মিতব্যয়ী।যখন যতটুকু আয় ততটুকুই ব্যায় করি।নিজের সাধ্যের বাইরের কোন জিনিষে অভ্যস্ত হইনি।পার্টি,রেস্টুরেন্ট,শপিং এসবে অভ্যস্ত হইনি। বরং সেই সময়টা স্টাডি আর নিজেকে দিয়েছি।ফলে আমার একটু আলাদা করে ভাবার, দেখার দৃষ্টি তৈরী হয়েছে।আমি নিজেকে ইউনিভার্সাল নাগরিক এবং মানসিকভাবে ভীষন স্মার্ট একজন মানুষ ভাবি।আমি একা সময় কাটাতে পাছন্দ করি,প্রকৃতি আমার সবথেকে প্রিয় যার জন্য গ্রামে সময় কাটাতে যাই।বাংলাদেশের মাটি,পানি,বাতাস আমাকে ভীষন টানে।সেই থেকেই আমার এগ্রো ফার্ম “খনা অর্গানিক”র জন্ম!
কৃষি আমাদের পারিবারিক পেশা নয় কখনো।আমাদের জমি আছে,যা অন্য কৃষকদের দিয়ে চাষ করানো হয়।আমাদের পরিবার আত্মিয়দের অনেকেই ব্যাবসা করেন আর বেশীরভাগ চাকুরি।আমার বাবা শিক্ষক, কাকা ব্যাংকার, মামা চাকরি, কেউ কেউ ব্যাবসা, বোন শিক্ষক।গতানুগতিক চাকরির ও ব্যাবসা করছে আমাদের তারা।আমি সেই পথে হাঁটতেই পারিনি।আমার মাথায় এমন ক্যারা যে,আমি গতানুগতিক কোন কিছুর সাথে তালই মিলাতে পারিনা, মন মানেনা।
করোনার সময়টাতে চারদিকে যখন কেবল হা-হুতাশ, ক্যারিয়ার নিয়ে শংকা,আমি সবথেকে ব্যাস্ত করলাম নিজেকে।শুটিং না থাকায় খামার, প্রডাকশন হাউস, আর কিছু কাজের কনসাল্টেন্ট হিসেবে পুরোদস্তর ব্যাবসায়ী হিসেবে দিনরাত কাজ শুরু করলাম।সেটাও অবশ এই লেখার মতো সহজ ছিলোনা কিন্তু নতুন ধরনের কাজ বলে উৎসাহের চোটে করতে পারলাম!এবং জীবনের যেকোন সময়ের চাইতে বেশী টাকা ইনকাম করলাম আর দুহাতভরে খরচ করলাম!
এই সময়টায় আমার জীবনে নব্যুয়ত প্রাপ্তির মতো বদল ঘটতে থাকলো!জীবনের দর্শন আরো ভারি হয়ে ওঠলো। অপরিচিত মানুষের প্রতিও কেমন দায়িত্ব বোধ করতে শুরু করলাম।যেকোন মানুষের পাশে দাঁড়াতে থাকলাম, সাহায্য করা শুরু করলাম সাধ্যমতো।পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালনে আরেকটু মনোযোগী হলাম। গাছপালা-প্রকৃতি বেশী আপন হয়ে উঠলো।জীবনে যা ভাবিনি তাই করে বসলাম-একটা কুকুর কুড়িয়ে এনে তার মা হয়ে উঠলাম।আমার কৈশোরের বই পড়ার অভ্যাসটা আবার ফিরে আসলো।দিনরাত কাজ করার শক্তি বেড়ে গেলো,একজন মানুষ আমি গড়ে ৫জনের সমান কাজ করি।আগের মতো পাওয়া না পাওয়ার হিসাব না করে প্রতিদিন বাঁচতে শুরু করলাম।যে কোন সময় মৃত্যুর জন্য জীবন প্রস্তুত আমার।
আমি এখন ১০/১২জন লোকে কর্মসংস্হান করছি আমার ২ কোম্পানির বদৌলতে।এমন কিছু কর্ম পরিকল্পনা করেছি যা আসলে সাকসেসফুল হওয়ার পরই বলবো।আমার ইচ্ছা ছোটখাট চাকরির অপেক্ষায় বসে না থেকে ব্যাবসা ও কৃষির প্রতি মানুষকে আগ্রহী করা,অকারনে শহরমুখী হওয়ার প্রবনতা বন্ধ করা।আর মেয়েদের গতানুগতিক কাজের বাইরে চ্যালেন্জিং পেশায় উদ্বুদ্ধ করা। বিশেষ করে কৃষি শিল্পে কারন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির অপার সম্ভাবনা।
আর এই সবকিছু করতে গিয়ে বরাবরের মতোই পারিবারিক বাঁধা,সামাজিক টিপ্পনী! আমিও বরাবরের মতো এসবকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দ্বিগুন উৎসাহে এগিয়ে যাচ্ছি।
অবশ্য আমার এত প্রানশক্তি,কাজের উদ্দীপনা নিজের কাছেই অবাক লাগছিলো! জানুয়ারিতে আমার ডক্টরের কাছে গেলাম প্রায় ১বছর পর।যদিও ৬মাস পর যাওয়ার কথা ছিলো, করোনার জন্য ফ্লাইট বন্ধ থাকায় যাওয়া হইনি।আমার ডক্টরের চেম্বার কোলকাতায়।ডক্টর বললো সবকিছু বেশী বেশী ঘটার কারন কিছুটা ওষুধের প্রভাব,মাত্রা কমিয়ে দিলেন।
ওহ,আমি ১০১৭সাল থেকে ডিপ্রেশনের ট্রিটমেন্টে আছি।এই যে সব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে একা এগিয়ে যাওয়া,তার একটা বেদনা তো থাকেই।আজ এ পর্যন্ত থাকুক।