পাঠ্যপুস্তকে এ কথা সবাই পড়েছি বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ কিংবা বাংলাদেশ একটি বদ্বীপ। হাই কোর্টের এক রায়ে নদীকে জীবন্ত সত্ত্বা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। লক্ষ বছর ধরে জালের মত ছড়িয়ে থাকা নদীর পানি ও পলি দিয়ে গঠিত হয়েছে বাংলাদেশ। সেই দেশ আজ পানির অভাবে মরুকরণের হুমকীর মুখে। এই পানির অভাব কিন্তু প্রাকৃতিক কারণে নয়। বাংলাদেশের প্রধান দুই বড় নদী পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, চীন, নেপাল, ভুটান ও ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে অসংখ্য নদীতে পানি সরবরাহ করে জালের মত ছড়িয়ে গেছে। এছাড়াও ৫৪ টি নদী ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এই নদীগুলোই বাংলাদেশের প্রাণ প্রবাহ। কিন্তু আন্তর্জাতিক সমস্ত নীতি লঙ্ঘন করে ভারত ৫১টি নদীর উজানে বাঁধ দিয়েপানি সরিয়ে নেয়ার আগ্রাসী তৎপরতার ফলে নদীগুলোর পানিপ্রবাহ কমে গিয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে দেশের অভ্যন্তরে নদী দখল ও দূষণ। ফলে নদীগুলো বাংলাদেশকে বাঁচাবে কি নিজেরাই এখন মৃত্যু পথযাত্রী।


ইতিহাসে দেখা যায় এক সময় বাংলাদেশে ১২০০ নদী ছিল। কমতে কমতে নদীর সংখ্যা এখন ২৩০-এ নেমে এসেছে। খরা মৌসুমে এর বেশিরভাগ নদীতে পানি থাকে না। একসময়ের প্রমত্তা অনেক নদীই এখন খালে পরিণত হয়েছে। তেমনি এক যৌবন হারানো শীর্ণকায়া নদীর নাম তিস্তা। কিন্তু প্রবাহের দিক থেকে তিস্তা দেশের ৪র্থ বৃহত্তম এবং বৈশিষ্টের দিক থেকে আন্তর্জাতিক নদী। যার ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থিত জলপ্রবাহ নিয়ে অববাহিকার পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার বর্গ কিঃমিঃ। এর মধ্যে বাংলাদেশে আছে ২০ হাজার বর্গ কিঃমিঃ আর ভারতে পড়েছে ১০ হাজার বর্গ কিঃমিঃ। বাংলাদেশের কথা বিবেচনা না করে সীমানা থেকে প্রায় ৭০ কিঃমিঃ উজানে গজলডোবায় বাঁধ দেয়ার কারণে শুষ্ক মৌসুমে ২০১১ সালের পর থেকে পানি পাচ্ছে না বাংলাদেশ। ফলে খরা মৌসুম আসতে না আসতেই পানি প্রবাহ আশংকাজনকভাবে কমে কখনো ৫০০ কিউসেক এ নেমে যায়। অথচ ঐতিহাসিক গড় (১৯৭৩- ১৯৮৫) অনুযায়ী পানির প্রবাহ থাকার কথা কমপক্ষে ১০ হাজার কিউসেক। বর্ষায় প্রমত্তা তিস্তার পানি ধরে রেখে শীতে তা ব্যবহার করা যায় কিনা সেটা নিয়ে ভাবনা চিন্তা চলছে বহুদিন ধরে। এই চিন্তার অংশ হিসেবে তিস্তা ব্যারেজের বিভিন্ন ক্যানেলের মাধ্যমে সেচ মওসুমে লক্ষ্যমাত্রা রংপুর, দিনাজপুর ও নীলফামারী কমান্ড এলাকায় ১ লক্ষ ১০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা প্রদান করা হত। কিন্তু পানির অভাবে এখন তা কমে শুধু নীলফামারীতে ৮ হাজার হেক্টরে নেমে এসেছে। শুধু নদীর পানিই কমে নি ভুগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেছে ভয়ানকভাবে। এ কারণে বিকল্প সেচ ব্যবস্থাও বিপর্যস্ত হয়ে আর্সেনিকের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে আশংকাজনকভাবে।
তিস্তা নদীর বাংলা নাম এসেছে ‘ত্রি স্রোতা’ বা ‘তিন প্রবাহ’ থেকে। সিকিমে হিমালয়ের ৭,২০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত চিতামু হ্রদ থেকে এই নদীটি সৃষ্টি হয়ে দার্জিলিং এর শিভক গোলা নামে পরিচিত একটি গিরিসঙ্কটের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নিচে নেমে এসেছে। দার্জিলিং পাহাড়ে তিস্তা একটি খরস্রোতা বন্য নদী এবং এর উপত্যকা ঘনবনে আচ্ছাদিত। পার্বত্য এলাকা থেকে প্রথমে প্রবাহটি দার্জিলিং সমভূমিতে নেমে আসে এবং পরে পশ্চিমবঙ্গের (ভারত) দুয়ার সমভূমিতে প্রবেশ করে তারপর নদীটি নিলফামারী জেলার কালীগঞ্জ সীমান্ত এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে ।

ছবিসূত্র: লেখকের ফেসবুক থেকে


আজ আমরা বাংলাদেশের নদীগুলোকে যে এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হতে দেখছি অতীতে তা ছিল না। ১৫০০ সালের পর থেকে বাংলার অনেক নদীর নদীখাতই ভৌগোলিক কারণে পরিবর্তিত হয়েছে। তিস্তা নদীর তাদের মধ্যে একটি। তিস্তা নদী আগে জলপাইগুড়ির দক্ষিণে তিনটি ধারায় প্রবাহিত হত: পূর্বে করতোয়া, পশ্চিমে পুনর্ভবা ও মধ্যে আত্রাই। সম্ভবত এই তিনটি ধারার মিলিত প্রবাহের কারণে ত্রি-স্রোতা নামটি এসেছিল, যেটি কালক্রমে বিকৃত হয়ে দাঁড়ায় তিস্তা। তিনটি ধারার মধ্যে পুনর্ভবা মহানন্দায় মিশে যেতো। আত্রাই চলন বিলের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে করতোয়ায় মিশে যেতো। তারপর আত্রাই-করতোয়ার মিলিত প্রবাহটি জাফরগঞ্জের কাছে মিশে যেতো পদ্মায়। ১৭৮৭ সালের এক বিধ্বংসী বন্যার পর তিস্তা তার পুরনো খাত পরিবর্তন করে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে গিয়ে মিশে যায় ।


রেনেলের মানচিত্রে (১৭৬৪-১৭৭৭) দেখা যায় তিস্তা উত্তরবঙ্গের একাধিক শাখায় (পুনর্ভবা, আত্রাই, করতোয়া ইত্যাদি) প্রবাহিত হত। সবকটি ধারা উত্তরবঙ্গের এখনকার পশ্চিম দিকের নদী মহানন্দায় মিশত। তারপর হুরসাগর নাম নিয়ে অধুনা গোয়ালন্দের কাছে জাফরগঞ্জে পদ্মায় মিশে যেতো। হুরসাগর নদীটি এখনও আছে। তবে পদ্মার বদলে এটি এখন মিশে যায় যমুনা নদীতে। ১৭৮৭ খ্রিষ্টাব্দের অতিবৃষ্টিতে এক ব্যাপক বন্যার সৃষ্টি হয় এবং সেই সময় নদীটি গতিপথ পরিবর্তন করে নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম এবং গাইবান্ধা জেলার মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হয়ে চিলমারী নদীবন্দরের দক্ষিণে ব্রহ্মপুত্র নদে পতিত হয়। তিস্তা নদীর সর্বমোট দৈর্ঘ্য ৩১৫ কিমি, তার মধ্যে ১১৫ কিমি বাংলাদেশ ভূখণ্ডে অবস্থিত। তিস্তা একসময় করতোয়া নদীর মাধ্যমে গঙ্গার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল এবং এর অংশবিশেষ এখনও বুড়ি তিস্তা নদী নামে পরিচিত।

ছবিসূত্র: লেখক সূত্রে প্রাপ্ত


এতো গেল তিস্তার ইতিহাস। যে তিস্তা রংপুর অঞ্চলের প্রধান পানির উৎস তার দিকে তাকালে যে কেউ বলবেন যে এ নদীর মরণ দশা ঘনিয়ে এসেছে। এই মরণ সংকটে তিস্তা একদিনে পড়েনি। মানবদেহ থেকে সিরিঞ্জ দিয়ে রক্ত টেনে নেবার মত করে বিভিন্ন জায়গায় বাঁধ দিয়ে তিস্তার পানিকে টেনে নিয়েছে ভারত। এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে অনেক তবে ফল হয় নি কিছুই।


১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে তিস্তা নদীর পানি ভাগাভাগির ব্যাপারে স্থির হয় যে, তিস্তা নদীর পানির শতকরা ৩৬ শতাংশ পাবে বাংলাদেশ এবং ৩৯ শতাংশ পাবে ভারত। বাকি ২৫ শতাংশ নদী প্রবাহের জন্য নদীতেই সংরক্ষিত রাখা হবে। কিন্তু কখন থেকে এবং কোথা থেকে এই পানি ভাগাভাগি করা হবে সে বিষয়ে কোন দিক-নির্দেশনা ছিল না। অনেক বছর পরে ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৫, ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত একটি যৌথ বৈঠকে বাংলাদেশ তিস্তার পানির ৮০ শতাংশ দুই দেশ ভাগ করে বাকি ২০ শতাংশ নদীর জন্য সংরক্ষিত রাখার বিষয়ে প্রস্তাব দেয়। ভারত এই প্রস্তাবে অসম্মতি প্রকাশ করে। শুধু তাই নয় তিস্তা নদীর উজানে ভারত জলপাইগুড়ি জেলার মালবাজার মহকুমায় গজলডোবা বাঁধ নির্মাণ করে বাংলাদেশে স্বাভাবিক জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে । ২০১৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিস্তা নদীর মূল জলপ্রবাহের উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশের তিস্তায় আসতো। ২০১৪ সাল থেকে শুষ্ক মৌসুমে ভারত তিস্তার পানি প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বলেন, ‘তিস্তার মূল প্রবাহ ভারত প্রত্যাহার করে নিয়েছে। তিস্তায় ডালিয়া ব্যারাজে উজান থেকে আসা জলপ্রবাহ প্রায় শূন্য। এখন যে ৬০০ – ৭০০ কিউসেক আসে ধারণা করি তা আসে, ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের ভাটির উপনদী থেকে’। বাস্তবে তিস্তার পানির ব্যাপারে ভারত আন্তর্জাতিক আইন ও মামলার কোন উদাহরণ মানছে না। ফলে ক্রমাগত পানি প্রত্যাহার করায় পানির অভাবে বাংলাদেশ অংশে তিস্তা মরে গেছে। ন্যায়সঙ্গত পানি বণ্টনের ব্যাপারে ভারতের একগুয়েমিতা, অনৈতিক ঢিলেমি ও হটকারীতায় তিস্তা তীরবর্তি ও আশেপাশের প্রকৃতি রুক্ষ ও মরুময় হয়ে উঠেছে। আবার বর্ষা মৌসুমে বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে বয়ে আসা অজস্র পাথর, নুড়ি, বালি আর পলি পড়ে তিস্তার বুকে শুষ্ক মৌসুমে তৈরি হয় বালুর স্তুপ, যা সূর্যের তাপে উত্তপ্ত হয়ে উঠে। তখন তিস্তার চরকে মনে হয় সাহারা মরুভুমি। অন্যদিকে বর্ষাকালে পানি ছেড়ে দেয়ায় প্রবল পানির চাপে মুল গতিপথ বদলে তিস্তা প্রচন্ডভাবে প্রবাহিত হতে থাকে। তখন মনে হয় এ এক কুল কিনারা-বিহীন সমুদ্র। পানির চাপে ভাঙতে থাকে নদীর দুই তীর। এই ভয়াবহ ভাঙ্গনে প্রতি বছর ২০ হাজার মানুষ বাড়িঘর, গাছপালা, আবাদী জমি হারিয়ে ভূমিহীন ও ছিন্নমূল হয়ে পড়ে। নদীর প্রবাহ পথে বিশাল চর ও উভয় তীরে ভাঙ্গনের তান্ডবে তিস্তার বাংলাদেশ অংশে এর প্রস্থ কোন কোন জায়গায় ৫ কিলোমিটারেরও বেশি হয়ে পড়ে। এই তিস্তা পানি বণ্টন নিয়ে চলছে প্রতিশ্রুতি ও প্রতারণার এক নিম্নমানের খেলা। ভারত সরকার চান বাংলাদেশ তার পানির ন্যায্য অংশ পাক, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার চায় না। এই সব কথা শুনছি বছরের পর বছর। কিন্তু তিস্তার বুক থেকে পানি সরিয়ে নেয়া বন্ধ হচ্ছে না।

ছবিসূত্র: লেখক সূত্রে প্রাপ্ত


উত্তরবঙ্গ বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য চালসহ আলু, সব্জি, ফল সরবরাহকারী অঞ্চল। এখানে তেমন শিল্প কারখানা নেই। কৃষি ব্যবস্থা পুরোটাই পানির উপর নির্ভরশীল ফলে বন্যা খরা এখানে মানুষের দুর্ভোগের কারণ। এই বন্যা এবং খরা দুটোই এখন নিয়ন্ত্রণ করছে ভারত। তিস্তা অঞ্চলে ৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ দেয়ার পরিকল্পনা ভেস্তে যাচ্ছে সময়মত এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পানি না পাওয়ার কারণে। খুব কম করে হিসেব করলেও হেক্টরে ৫ টন ধান উৎপাদন সম্ভব। ফলে ৪৫ লাখ টন ধান উৎপাদন আজ মারাত্নক ঝুঁকিতে। মাছ উৎপাদন, ভু গর্ভস্থ পানির স্তর পূরণ করা, নাব্যতা রক্ষা, পরিবেশ ও প্রাণ প্রকৃতি রক্ষা করার কথা ভাবলে এক অশনি সংকেত দেখতে পাচ্ছে সবাই। তিস্তা বাঁচায় উত্তরবঙ্গ বিশেষ করে রংপুর অঞ্চলকে। ভারত কর্তৃক ক্রমাগত বাঁধ নির্মাণ ও পানি প্রত্যাহারের ফলে একদা স্রোতস্বিনী এই তিস্তা বাঁচবে কি ?