“তুমি চাইলেই গল্পটা পাল্টে ফেলতে পারো”

আমি এখন উত্তরের একটি গ্রামে আছি। গ্রামটা সেই জায়গায় অবস্থিত যা বর্তমানে ‘আলাস্কা’ নামে পরিচিত। এককালে এই এলাকাগুলোর নিজস্ব নাম ছিলো। সেসব অবশ্য ইংরেজি, রাশান বা অন্য যেকোনো রাজনৈতিকভাবে আরোপিত বাণিজ্যিক ভাষা চালুর অনেক আগেকার কথা।


এটা সেই সময়কার কথা যখন মানুষ স্বপ্ন দেখতো এবং মনে করতো যে তারা সবাই মিলে একক ও অবিচ্ছেদ্য সত্ত্বা। এর অর্থ এই নয় যে, তখন ব্যক্তিসত্ত্বা বলে কিছু ছিলো না। এখনকার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের সার্বজনীন ধারণার চাইতে বরং তখনকার মানুষেরা ব্যক্তিত্বে অনেক বেশি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বহন করতো। সে সময় গ্রামে থাকা সত্ত্বেও কারও কারও হয়তো এক পা থাকতো চাঁদে। কেউ কেউ আবার নারীর মতো পোশাক পরে নারীর জীবনযাপন করেও সেরা দর্জি হিসেবে পরিচিত ছিলো।

সেই গ্রামে আমি আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে গিয়েছিলাম। যে কিনা একই সঙ্গে আমার দূরসম্পর্কের আত্মীয়। আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের সঙ্গে বিয়ে, গোষ্ঠী কিংবা রক্ত সম্পর্কে সম্পর্কিত।

ঠিক যেদিন গ্রামে গিয়ে পৌঁছালাম, সেদিন রাতেই এক নারী নৃশংসভাবে খুন হলেন। খুন কোন সাধারণ ঘটনা নয়। এটা পুরো গ্রামকেই ঝুঁকির মুখে ফেললো। পরিস্থিতিটা দ্রুতই সামলানোর দরকার ছিলো যাতে করে অশুভ ছায়া বিপদের মাত্রা আরও বাড়িয়ে না দেয়।

জানের বদলা হিসেবে জান নিতে তাই সিদ্ধান্ত হলো আমাকে আর আমার বন্ধুটিকে মেরে ফেলা হবে। যাতে করে গ্রামে শান্তি ফিরে আসে। কেননা সেখানে আমরাই ছিলাম সব চাইতে প্রভাবশালী ছিলাম।

আমাদের যে হত্যা করা হবে-এটা কেউ আমাদের জানায়নি। কিন্তু তা আমরা জানতাম; হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম। যদিও ব্যাপারটা দুর্ভাগ্যজনক কিন্তু ঘটনাগুলো সাধারণত এভাবেই ঘটে থাকে।

পরদিন সকালে আমি আর আমার বন্ধুটি গ্রাম থেকে নিচে নামছিলাম। শুনতে পেলাম, হত্যাকমিটির লোকজন আমাদের খোঁজেই আসছে। পেছন থেকে তাদের শব্দ শুনতে পেলাম, তাদের হত্যার সরঞ্জাম আর পাথরসহ তাদের উপস্থিতি টের পেলাম। টের পেলাম উন্মত্ত চিৎকারসহ তাদের উদ্দেশ্য।

আমি জানি, তারা আমাদের হত্যা করতেই এগিয়ে আসছে। আমি আমাকে বহনকারী শরীরটাকে ধন্যবাদ জানালাম। জীবনের এই যাত্রায় সে আমার ভেতরের মানুষটাকে দারুণভাবে আগলে রেখেছে এবং জীবনকে উপভোগ করার সুযোগ করে দিয়েছে।

আমি শুনছি-শুনেই যাচ্ছি-হাড়ের মড়মড় শব্দ। উন্মত্ত গ্রামবাসী আমাদের মারতে এগিয়ে আসছে আর আমাদের প্রতি মুহুর্মুহু ঘৃণা বর্ষণ করছে। বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই এটা ব্যক্তিগত আক্রোশের ব্যাপার ছিল না। তাদের মধ্যে খুব কম মানুষই এমন ছিল যার জন্য ঘটনাটা উপভোগ্য ছিলো।
আমি টের পেলাম, আমার শরীর হঠাৎ দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছে এবং তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে। এমন সময় আমার আত্মা শরীরের খোলস ছেড়ে হঠাৎ বেরিয়ে এলো। চক্রাকারে পাক খেতে খেতে ঘটনাস্থল থেকে সরে সমুদ্রের দিকে এগুতে থাকলো। সমুদ্রের ওপর দিয়ে উড়তে উড়তে আমার অন্তরাত্মা বলে উঠলো, “তুমি চাইলেই ফিরে গিয়ে গল্পটা পাল্টে ফেলতে পারো।”

এ কথা শুনে প্রথমেই যে ভাবনাটা আমার মাথায় এলো, “কেন আমি তা করতো চাইবো?” আমি তো এখন যাবতীয় জাগতিক চাওয়া-পাওয়া থেকে মুক্ত! পানি ও বাতাসের মতো স্বাধীনভাবে চলাচল করতে সক্ষম।
কিন্তু তারপর বুঝলাম, যেহেতু আমি পাখি কিংবা তিমি নই মানুষ, তাই আমি এটি করতে বাধ্য।

“গল্পটা পাল্টে ফেলা বলতে তুমি ঠিক কী বোঝাতে চাইছো?” জিজ্ঞেস করলাম।
অতঃপর আমি গ্রামের বাইরে যে জায়গাটায় আমার শরীরটা পড়ে রয়েছে সেখানে ফিরে গেলাম। ফিরে গেলাম সেই সময়ে যখন আমার জন্য নিশ্চিত মৃত্যু ও প্রতিশোধের হত্যাযজ্ঞ নির্ধারিত হয়ে আছে।
“এখন আমি কী করবো?” আবার আত্মার কাছে প্রশ্ন করলাম। “গল্পটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার এ ছাড়া অন্য কোনো পথ তো আমি দেখতে পাচ্ছি না।”
আত্মা জবাব দিলো, “তোমার কী করণীয় তা তুমি জানো। ভালো করে তাকাও, তবেই তুমি গল্পটা দেখতে পাবে।”

এরপর সমুদ্র আর আকাশের মতো একলা আমি ভাবার জন্য খানিক সময় নিলাম এবং আমার ভাবনাগুলোকে মাথার মধ্যে খেলা করতে দিলাম।
তখনই আমি পুরো ঘটনাটা দেখতে পেলাম। দেখলাম, ওই গ্রামেরই এক পুরুষ এক নারীর পিছে ঘুরঘুর করতো। নারীটি তার প্রতি একেবারেই আগ্রহী ছিল না। কিন্তু পুরুষটি তাতে নিরস্ত হয়নি। সিন্ধুঘোটক (ওয়ালরাস) শিকার করার জন্য সে যেভাবে হন্যে হয়ে তার পেছনে ঘুরতো ঠিক তেমন করেই নারীটিকেও সে অনুসরণ করতো। লোকটি ছিল গ্রামের সবচেয়ে সুচারু সিন্ধুঘোটক শিকারী। নারীটির বাড়িতে যেদিন কেউ ছিল না সেইদিন ওই লোকটি তার বাড়িতে গিয়ে হানা দেয়। তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে এবং হত্যা করে। এরপর তার মৃতদেহটিকে টেনেহিঁচড়ে সমুদ্রের দিকে নিয়ে যায়। সমুদ্রের দিকে যাওয়ার পথে আমি তার পেছন পেছন রক্তের রেখা দেখতে পেলাম। সে যখন সমুদ্রের ধার দিয়ে একা ফিরছিলো তখন রক্তের রেখার ওপর আমি তার পায়ের ছাপও দেখতে পেলাম।

আমি আর আমার বন্ধুটি গ্রামের মাঝে দাঁড়িয়ে। গ্রামবাসী আমাদের হত্যা করার বিষয়ে নিজেদের মধ্যে আলাপ করছে। আমার এবং আমার বন্ধুটির প্রতি তাদের মনোভাব কেমন তা আঁচ করতে পারছিলাম। আমি একটি ঢোল হাতে নিয়ে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম এবং বললাম, “তোমাদেরকে আমার একটি গল্প বলার আছে।”

গল্পের আবহ তৈরি করতে আমি ঢোল বাজাতে আরম্ভ করলাম এবং তার তালে তালে নাচলাম। গ্রামবাসী তাতে এমনই মজে উঠলো যে তারা আরও শুনতে চাইছিলো। তারা আমাকে জিজ্ঞেস করলো, তাদের বলার মতো কী এমন গল্প আছে আমার কাছে?
আমি তখন গান গেয়ে নেচে নেচে সিন্ধুঘোটক শিকারীর গল্পটা তাদের শোনালাম। পুরুষটি যে গ্রামের সবচেয়ে ভালো সিন্ধুঘোটক শিকারী তা বললাম। সিন্ধুঘোটকের সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন ছিল তা বর্ণনা করলাম। কী করে সে নিজের লোকেদের জন্য আহারের বন্দোবস্ত করতো তা বললাম। কী করে সে বরফখণ্ডের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় সিন্ধুঘোটকদের তার জাদুকরী কণ্ঠস্বর দিয়ে প্রলুব্ধ করার দক্ষতা অর্জন করেছিলো, সেটিও বললাম।

এরপর আমি তাদেরকে বললাম, কী করে সেই শিকারী ব্যক্তিটি নারীর মতো দেখতে একটি সিন্ধুঘোটককে হত্যা করেছিলো। নারীটির কী কী বৈশিষ্ট্য ছিল তা বর্ণণা করলাম, যার মধ্যে ওই লোকটি একটি সিন্ধুঘোটককে দেখতে পেয়েছিলো। ইতিমধ্যে, গল্পটি নিজেই জীবন্ত হয়ে উঠেছিলো। এটি গাইছিলো, নাচছিলো, এমনকি শ্বাসও নিচ্ছিলো। গল্পটি নিজেই কতকিছু জানে তা দেখেশুনে আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাচ্ছিলাম।

ঢোলে শেষ বাড়ি মারার আগে, গল্পের শেষ অংশ বলবার কিছুক্ষণ আগে গ্রামবাসীর জমায়েতের মধ্য থেকে খুনী উঠে দাঁড়ালো এবং পালানোর চেষ্টা করলো। গ্রামবাসী একত্রে ঘুরে তার দিকে তাকালো এবং বুঝতে পারলো এই ব্যক্তিটিই প্রকৃত খুনী। তারা এটাও উপলব্ধী করতে পারলো যে, নিহতের আত্মার শান্তির জন্য এই ব্যক্তিরই জান কবজ করা উচিত। অন্য কারও নয়।

বর্তমানে আমি পৃথিবীর যে প্রান্তে ও সময়ে বাস করছি, সেখানেও সেই গানের সুর আমি প্রায়ই শুনতে পাই।
আমি আমার বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াই আর গানের তালে নেচে নেচে গল্পটা আপনমনে বলে উঠি।
এখনও আমার জিহবায়, শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে গল্পটা মিশে আছে। যেন এটা অনাদিকাল থেকে এমনিভাবেই ছিলো।
যদিও আমি এখন এমন এক শহরে বাস করি যেখানে পৃথিবীর নানা প্রান্তের নানা জাতিগোষ্ঠী, ভাষাভাষী মানুষেরা থাকে।

এখানে আমরা এলোমেলোভাবে আলাদা আলাদা অনেক গল্প আউড়ে যাই। গল্পের হইহট্টগোল তৈরি করি। কিন্তু আমরা একত্রে কোনো স্বপ্ন দেখি না।

ইংরেজি থেকে অনুবাদঃ কানিজ ফাতেমা মিথিলা

অনুবাদক: কানিজ ফাতেমা মিথিলা