আমি রুহুল আমিনকে চিনি না। কিন্তু এর ওর কাছে আমি এই মানুষটার খোঁজ নেবার চেষ্টা করি। কেন করি? কারণ আমি পত্র পত্রিকায়, মিডিয়াতে তার খবর অতোটা পাই না যতোটা পাবার কথা ছিল। আমাদের মধ্যবিত্তীয় যে সুশীল একটা আবেগী প্রতিবাদী মন আছে তা খুব শ্রেণী ছকে চলে। ধরেন কিশোর, কাজল, মুশতাক যেই পড়তে জানা, টেকনোলজির জ্ঞান থাকা, এবং ডিভাইসের একসেস থাকা অডিয়েন্সের জন্য লিখতেন, আঁকতেন, তথ্য-খবর শেয়ার দিতেন, সেই অডিয়েন্সের অনেক মানুষকেই মুশতাকদের বন্দীত্ব, নির্যাতন, মৃত্যু নাড়া দেয়। কিন্তু ওই সুশীল অডিয়েন্স তাদের যাবতীয় প্রিভিলেজ নিয়ে মুশতাকদের দুর্দশার সাথে যতোটা রিলেট করতে পারেন, রুহুল আমিনের মতো পাট শ্রমিক নেতার সাথে ততটা পারেন না। কারণ, মিহি জুট-কটনের বাহারি দামী পাঞ্জাবী কিংবা শাড়ী পড়ে “দেশীয় পণ্য কিনে হই ধন্য’ টাইপ অনুভূতি নিয়ে চলতে, বসতে, ঘুরতে থাকা এলিট-মধ্যবিত্তদের ‘নিজের’ লোক না এই রুহুল আমিন।


ফেল করতে করতে ইন্টার মিডিয়েটে পাশ করে যাওয়া রুহুল আমিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে পাশ করে বের হয়ে কোনো চাকরি করেন নাই। কিন্তু শোনা যায় টাকার অভাবে উনি রিক্সা চালিয়েছেন। বাম রাজনীতির মধ্যবিত্তীয় ধারার সাথে তার সংযোগ ঘটে নাই কখনো। “আমাদের দুর্নিবার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে” বলে চোস্ত বাংলায় স্লোগান দেন নাই। কিন্তু খুলনায় যখন পাটকল শ্রমিকেরা বেঁচে থাকার জন্য আন্দোলন করছে তখন রুহুল আমিন শ্রমিকদের ভাই হয়ে উঠতে পেরেছিল। পাটকল শ্রমিকের ইউনিয়ন সিবিএ নেতাদের ইঙ্গিত, আদেশ, নির্দেশ, ডাক ছাড়া শ্রমিকরা কখনও আওয়াজ তোলেন না। কিন্তু সেই শ্রমিক ইউনিয়ন যখন রাষ্ট্রের পাটকল বন্ধ করে শ্রমিকের অধিকারের পেটে লাথি মারা চুপচাপ মাথা নিচু করে মেনে নিলো, তখন রুহুল আমিন হাজার হাজার শ্রমিককে রাস্তায় প্রতিবাদে নামাতে পেরেছিলেন। কেও যেই স্বপ্নটা দেখতে চায় নাই, রুহুল আমিন শ্রমিকদেরকে সেই স্বপ্নটা দেখাতে চেয়েছিলেন। সোনালী আঁশের স্বপ্ন। কিন্তু রুহুল আমিন বুঝতে চান নাই যে ‘সোনার দেশে’ এর ‘সোনার মানুষ’ এখন শুধু কংক্রিটের ব্রিজে বিক্রি হয়ে যায়। এই দেশে শ্রমিকের কারখানা থেকে, লেখকের কলম থেকে, শিল্পীর রং থেকে, গরীবের ভাত থেকে খালি ছাঁটাই চলে … রুহুল আমিন প্রচন্ডভাবে মার খাওয়া একজন মানুষ, যেমনটা তার শ্রমিক ভাইরা। পাটকল বন্ধ হয়ে গেছে। রাষ্ট্রের কাছে জমা থাকা নিজের লাখ টাকার হিসেব গুনতে গুনতে শ্রমিক এখন তরকারি বেঁচে কারখানার তালা মারা দরজার সামনে বসে, কেও বা রিক্সা চালায় অচেনা শহরের অচেনা রাস্তায়। অনেকেই আর কিছু করে না, তাদের শুধু শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকা । আর রুহুল আমিন হাজতে বসে গুনে যায় তার দিন-রাত্রির মুহূর্তদের। তবুও রুহুল আমিন আমার কাছে ব্যর্থ মানুষ না। কারণ তিনি কিছু মানুষকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন … বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন যে আওয়াজে আওয়াজে কারখানার বন্ধ তালা ভাঙা যায় যদি চাওয়া যায়, যদি এক কাতারে দাঁড়িয়ে চিৎকার করা যায় …


আজকে রুহুল আমিনের দ্বিতীয় বারের মতো জামিনের আবেদন খারিজ হলো। যারা আওয়াজ তোলেন, পুলিশের মারে মাথা ফাটান, কিন্তু তারপরও রাস্তায় নামেন – শুধু সেই তারা ছাড়া আজ আর ওই সুশীল অডিয়েন্স নাই। কতগুলো জামিন নাকচ হবার পর, কতোটা লোহার পাত মোড়ানো লাঠির বাড়ি খাবার পর, কত খানি পুঁজ কান দিয়ে পড়ার পর, কতো ভোল্টের ইলেকট্রিক শক খাবার পর, কিংবা কতো ভয়াবহ যন্ত্রনায় লাশ হয়ে মরার পর আমরা মানবো, জানবো, বুঝবো যে রুহুল আমিন বলে একজন কেও ছিল?

(রুহুল আমিন সংক্রান্ত প্রাপ্ত তথ্য: মাহাথির মুহাম্মাদ।)