শহীদ রুমী পাঠাগারের গড়ে ওঠার যে প্রেক্ষিত, তা আলোচনা করার আগে কড়াইল বস্তি সম্পর্কে কিছু বলা আবশ্যক বিবেচনা করছি। কড়াইল বস্তি আর গুলশান সোসাইটিকে পৃথক করেছে গুলশান লেক। তিন লক্ষ অধিবাসীর প্রায় সবাই শ্রমজীবী। শিশু-কিশোরের সংখ্যা প্রায় এক লক্ষ। মাত্র দশ ভাগ শিশু স্থানীয় কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়ে। বাকি প্রায় ৯০ ভাগ, এনজিও দ্বারা পরিচালিত স্কুলে ফ্রীতে প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ শেষ করে কিংবা করে না। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর অধিনে সেখানে কর্মজীবী শিশুদের জন্য মৌলিক শিক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিলো রিক নামের একটি এনজিও। ঝরে পড়া এবং কর্মজীবী শিশুদের জন্য মৌলিক শিক্ষা নিশ্চিত করা ছিলো এর উদ্দেশ্য। ২০০৯ সালে আমি জীবিকার জন্য এ ধরনের একটি স্কুলে শিক্ষকতার পেশা গ্রহণ করি। ঐ সময়কালে আমি বাসদ রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে শোষণ বৈষম্যহীন, শ্রেণীহীন সমাজ গড়ার লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছি। স্কুলের শিক্ষক হওয়ার সুবাদে হাফিজ, জাহাঙ্গীর, শিপন, হাসানুজ্জামান অর্থাৎ যারা আমার ছাত্র-ছাত্রী ছিলো তাদের সাথে এবং তাদের পরিবারের সাথে আত্মীয়ের ন্যায় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এ সময়ে আমি প্রায় প্রতিদিনই গল্প শোনাতাম ছেলে-মেয়েদের। এ গল্পে যেমন ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, নেতাজীরা থাকতেন তেমনি থাকতো পাইরেটস অফ ক্যারাবিয়ান, ক্রনিকল অফ নার্নিয়ার মতো গল্পও। মাঝে মাঝে আমরা (আমি এবং ছেলে-মেয়েরা) আশার মাচায় যেতাম গল্পের বই পড়ার জন্য। গুলশান লেকের উপর বাঁশের মাচা দিয়ে তৈরি একটি মাচা। প্রসঙ্গত বলে রাখি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক স্থপতি খন্দকার হাসিবুল কবির ২০০৭ সালে এটি নির্মাণ করেন তার একটি গবেষণা প্রজেক্ট হিসেবে। পরবর্তীতে এ ছেলে-মেয়েদের মধ্যে সম্ভবত এই গল্প শোনা আর মাচায় বই পড়ার প্রভাব কাজ করেছিলো। প্রকল্পের মেয়াদ (৪০ মাস) শেষ হয়ে গেলে স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। ছেলে মেয়েরা তখন ব্র্যাক স্কুলে ভর্তি হয়। এ সময়েও ছেলে-মেয়েদের সাথে আমার যোগাযোগ ছিলো। কড়াইলে।য়মিত আসা-যাওয়া ছিলো। ওরা ছিলো আমার বেঁচে থাকার অক্সিজেন। ততদিনে বাসদ রাজনীতিতে প্রায় সাত বছর পার করে ফেলেছি। রাজনীতিটা একটু আধটু বুঝতে শিখেছি। পিছনে ফিরে ভাবলাম সাত বছরে মানুষকে কি দিয়েছি? মনে হলো কাজের তুলনায় প্রায় কিছুই দিতে পারি নি। ফলাফল শূন্য। সবাই মিলে পণ্ডশ্রম করে যাচ্ছি আর অলিক স্বপ্ন দেখছি। যে রাস্তায় হাঁটছি, যাদের নেতৃত্বে হাঁটছি তাদের প্রতি নূন্যতম আস্থা রাখতে পারছি না। এ সময়টা আমার জীবনে ভিষণ বেদনার সময়। এ রাজনীতি আমাকে তীব্রভাবে মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। সমাজের প্রতি দায়িত্বশীলতা, মানবিকতার যে বোধ তৈরি করেছে তা প্রতিনিয়তই আমাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। সমষ্টির প্রতি আস্থা রাখতে পারছিলাম না বলে ভাবলাম এমন একটা কাজ করবো যার ফলাফল আমি নিজ চোখে দেখতে পারি বা উপলব্ধি করতে পারি। বেঁচে থাকতে হলে কিছুতো একটা করতে হবে। রাজনীতি আমার মাঝে এই চেতনা তৈরি করেছে যে, শুধুমাত্র নিজেকে নিয়ে, নিজের জন্য বেঁচে থাকার মাঝে কোনো আনন্দ নেই, মানুষের মঙ্গল সাধনের মধ্যেই সত্যিকারের আনন্দ নিহিত। এ সময়কালে আমি প্রায়ই কড়াইলে যেতাম এবং আমার ছেলে-মেয়েদের সাথে কথা বলতাম, একাডেমিক পড়াশোনার তদারকি করতাম। ওদের সাথে আমি মিলিত হতাম ওদের বন্ধু শাওনের বাসায়। আশার মাচা তখন ভেঙে দেয়া হয়েছে গুলশান লেককে অবৈধ দখল মুক্ত করার রাষ্ট্রীয় অভিযানে। মনে মনে এখানে একটি পাঠাগার করার সাধ লালন করতে লাগলাম। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম না কিভাবে শুরু করবো। একদিন শাওনের বাসায় গল্প করছিলাম। প্রায় ৭০ বর্গফুটের বাসা, বস্তির রুমগুলোর সাইজ যা হয় আরকি। তিন চারজন বসে আছে অন্যরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছে। যারা জায়গা পেয়েছে তারা রুমের ভিতরে বসেছে আর যারা পায়নি তারা বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু মন দিয়ে শুনছে। গল্পের বিষয় ছিলো ওদের সব বন্ধুরাই প্রেম করে। এখন এটা করা উচিৎ কিনা? আমি বলেছিলাম যে উচিৎ নয়, কেন উচিৎ নয় তা ব্যাখ্যা করছিলাম। ওদের বয়স তখন কত হবে আর, বার কি তের বছর। গল্প শেষে ওরা বললো যে, কথাগুলোতো আমরা আমাদের বন্ধুদেরও বলতে পারি। তখনই আমি আমার মনের কথাটা বলে ফেললাম। প্রস্তাব করলাম, আসো আমরা একটা পাঠাগার করি। ওখানে বসে আমরা নানা বিষয়ে আড্ডা দিবো, গল্প করবো, বই পড়বো। যারা পড়াশুনা করতে পারেনি আমরা তাদেরকে যতটুকু পারি মৌলিক শিক্ষাটা দেয়ার চেষ্টা করবো। বন্ধুদেরকে বলো, তোমরা এখানে সেখানে আড্ডা না দিয়ে চলো আমরা পাঠাগারে আড্ডা দেই, বই পড়ি। এই ছিলো এপ্র্যোচ। মনোবাসনা ছিলো এখান থেকে একদল ছেলে – মেয়ে নতুনভাবে জন্ম লাভ করবে, যারা সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হবে, মুক্তচিন্তার মানুষ হবে, শুধু বুকিশ হবে না অন্যায় দেখলে রুঁখে দাঁড়াবে।ওরা প্রশ্ন করলো পাঠাগার যে করবো, টাকা আসবে কোথা থেকে। বললাম, আমরা যার যেমন সামর্থ্য আছে সে অনুযায়ী দিবো, পাড়া মহল্লার লোকজনকে গিয়ে বলবো, আমরা একটা সামাজিক দায়িত্ব পালন করছি, আপনি যদি আমাদের কাজটাকে ঠিক বলে মনে করেন তবে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করুন। শাওন, হাফিজ, জাহাঙ্গীর, শিপন, হাসানুজ্জামান, ফয়সাল  আর আমি পাঠাগারের জন্য রুম খোঁজা শুরু করলাম। ২২০০ টাকায় আট ফুট বাই নয় ফুটের একটা ছোট রুম ঠিক করলাম আমরা। ২০১৪ সালের ১লা অক্টোবর মাত্র ছয় জন সদস্য নিয়ে শহীদ রুমী স্মৃতি পাঠাগার যাত্রা শুরু করলো। কারো পকেটে একটা পয়সাও নেই। আমি বেকার। বাকি পাঁচজনতো বাচ্চা ছেলে, বার কি তের বছর বয়স। আমাদের পুঁজি ছিলো, আমাদের বিশ্বাস আর দৃঢ় মনোবল। আমরা নিশ্চিত ছিলাম যে আমরা পারবো। শাওন ওর বন্ধুদের নিকট থেকে ঐ মাসে দুই হাজার টাকা সংগ্রহ করেছিলো। তিতুমির কলেজের ছাত্রফ্রন্টের প্রাক্তন নেতা ফজলুল হক শাহীন ভাই পাঁচশত টাকা দিলেন সাথে একটা সিলিং ফ্যানও। শাহীন ভাই অবশ্য দীর্ঘদিন পর্যন্ত পাঁচশত টাকা করে দিতেন যদিও খুব কম টাকা বেতন পেতেন উনি। বেশ কিছু বইয়ো দিয়েছিলেন তিনি। প্রায়ই বন্ধুদের কাছে হাত পাততেন পাঠাগারের জন্য। এরকম কয়েকজন শুভানুধ্যায়ী ছিলো পাঠাগারের। যারা আসলে পাঠাগারের খরচের সিংহভাগই যোগান দিতেন। আর একেবারেই যখন আমরা খরচ মেটাতে পারতাম না তখন বস্তির দোকান-পাট বাসা বাড়িতে গিয়ে গণচাঁদা সংগ্রহ করতাম।
এভাবে আর্থিক দিক সামাল দিতাম আমরা। একটা মজার বিষয় হচ্ছে পাঠাগার প্রথম তিন মাস অতিবাহিত করেছে কোন নাম ছাড়াই। তিন মাস পর নারী মুক্তি কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় সভাপতি সীমা দত্ত বললেন, পাঠাগারের একটা নাম ঠিক করে ফেলা দরকার। তখন তিনি প্রস্তাব করেন পাঠাগারটি জাহানারা ইমামের জ্যেষ্ঠ পুত্র শহীদ শাফি ইমাম রুমীর নামে হতে পারে। কারণ রুমীর যে দৃষ্টিভঙ্গি, শোষণ-বৈষম্যহীন, শ্রেণিহীন সমাজ গড়ার আকাঙ্খা, তা আমরাও ধারণ করি। বিশেষ করে নিজের ক্যারিয়ারের, একটা নিশ্চিত প্রাচুর্যের জীবন পায়ে ঠেলে দিয়ে দেশের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার শিক্ষা আমরা রুমীর নিকট থেকে পাই। আমরা সবাই আলাপ-আলোচনা করে রুমীর নামে এবং “পাঠাগার হোক মানুষ গড়ার হাতিয়ার” এই স্লোগান নিয়ে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। সীমাদি পাঠাগারে যুক্ত হওয়ার কিছুদিন পরে ছাত্রনেতা শরিফুল চৌধুরীকে যুক্ত করেন পাঠাগারের সদস্যদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা গড়ে তোলার জন্য। শরিফুল চৌধুরী চলে গেলে তার স্থলাভিষিক্ত হন সাঈদুল হক নিশান। এখানে আরেকটা বিষয় বলে রাখি, আমাদের পাঠাগার পরিচলানার প্রক্রিয়া-পদ্ধতি, ডকুমেন্টাশন এ কাজগুলো প্রধানত জসিম উদ্দিন করতো। জসিম উদ্দিন ভাই পাঠাগার গড়ে ওঠার শুরুর দিকে শশরিরে না থাকলেও পরিকল্পনা প্রণয়ন, কর্মসূচি নির্ধারণ এ সকল ক্ষেত্রে উনি যুক্ত থাকতেন । 
পাঠাগার শুরু হওয়ার পর থেকে হাফেজ, জাহাঙির, শিপন ওদের হাত ধরে দলে দলে ছেলে-মেয়ে পাঠাগারে আসতে থাকে। কিন্তু জায়গা ছোট বসার জায়গা হয় না। একটা মিটিং ডাকলে ৭২ বর্গফুটের একটা ঘরে কয়জনই বা বসতে পারে? ১৫/২০ জন গাদাগাদি করে ভিতরে বসে, আর ১৫/২০ জন বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকে। রুমের মধ্যে ইদুরের উৎপাত। মাটি তুলে ঘর ভরে ফেলে। যে পাঠাগারে আগে আসে তার কাজ হলো তার কাজ হলো মাটি, কুচি কুচি করে কাটা কাগজের টুকরোসমূহ, কাঠের গুড়ো ইত্যাদি বাহিরে ফেলে দিয়ে এসে রুম ঝাড়ু দিয়ে পরিস্কার করা। যেহেতু মেঝেতে বই রাখলে নষ্ট হয়ে যায় তাই ছেলেরা সস্তায় কিছু কাঠ কিনে এনে হাতে বানিয়ে ফেললো একটা বুক সেলফ। পাঠাগার কার্যক্রম বলতে শুধু বই পড়া পাঠচক্র করা আর বিনে পয়সায় একাডেমিক কোচিং করানোই নয় শুরু থেকেই এর পরিধি ব্যাপক এবং বিস্তৃত। সদস্যদের ব্যাক্তি জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে এমন সমস্ত বিষয়ে আমরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতাম এবং সে অনুযায়ী গাইড করার চেষ্টা করতাম।হয়ত কোনো একজন বেশ কয়েকদিন পাঠাগারে আসছিলো না। খোঁজ নিয়ে দেখা গেলো পরিবার থেকে তাকে কাজে দিয়ে দিয়েছে। কেউ হোটেল বয়ের কাজে, কেউ অফিসের ক্লিনার হিসেবে কিংবা কেউ বাসা বাড়ির কাজে যোগ দিয়েছে। আবার এমনও হয়েছে পরিবার মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিবে তাই পাঠাগারে আসতে নিষেধ করেছে। এসব বিষয় মোকাবেলা করতে গিয়ে অভিভাবকদের বোঝাতে হয়েছে। বারবার তাদের বাসায় যেতে হয়েছে। এই করে পরিবারগুলোর সাথে আমাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, আমাদের প্রতি আস্থা – বিশ্বাস তৈরি হয়েছে। সবাইকেই যে আমরা বোঝাতে সক্ষম হয়েছি তা নয়। যেমন, একটা মেয়েকে পরিবার বিয়ে দিয়ে দিবে। মেয়েটার বয়স ১৫ বছর। আমরা যতই বোঝাই কাজ হচ্ছে না। “আমার মেয়ে আমি বিয়ে দিবো আপনার কি?” আমরা মেয়েকে বলেছি, তুমি যদি পড়াশোনা করতে চাও তবে বাসা থেকে বেরিয়ে এসো। তোমার সমস্ত দায়িত্ব আমরা নিবো। এ নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না। আবার এমন পরিবারও আছে যারা পাঠাগার সদস্যরা বাসায় গেলে নিজ সন্তানের মতো করে ভালোবাসেন। কি খাওয়াবেন, কোথায় বসাবেন তার জন্য অস্থির হয়ে ওঠেন। পাঠাগারের সদস্য সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পর তাদের সার্বিক দেখাশোনা করার জন্য সিনিয়র নয়জন সদস্যের নেতৃত্বে নয়টি টিমে, সদস্যদের ভাগ করে দেয়া হয়েছে। টিমগুলোর নাম ঠিক করা হয়েছে প্রীতিলতা, সূর্যসেন, ক্ষুদিরাম, নেতাজী সুভাষ বোস, ভগৎ সিং, বেগম রোকেয়া, নজরুল, আইনস্টাইন, এবং ডিরোজিওর নামে। যেন এ মহান মানুষদের জীবনাদর্শ সদস্যদের স্পর্শ করে।টিম লিডারদের কাজ পাঠচক্র পরিচালনা করা, সদস্যরা বাসায় একাডেমিক পড়াশোনা করছে কিনা সে খোঁজ -খবর নেয়া, পাঠগার সম্পর্কে অভিভাবকদের ধারণা দেয়া, টিমের সদস্যদের ব্যাক্তিগত সমস্যা সমূহ শোনা এবং পারলে সমাধান করা। এ কাজ করতে গিয়ে টিম লিডাররা সদস্যদের আপন ভাই বা বোন হয়ে ওঠে। তারাই হয়ে ওঠে সদস্যদের সত্যিকার অভিভাবক। শহীদ রুমী শিক্ষা প্রাঙ্গনের প্রথম দিকে আমি একাই পড়াতাম। যদিও তখন এটা শিক্ষা প্রাঙ্গন হিসেবে আবির্ভূত হয় নি। ছেলে-মেয়েদের না পড়ালে তারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভের জায়গা থেকে ঝরে পড়বে, এই বিবেচনায় পাঠাগারের মধ্যে কোচিং-এর মত করে পড়ানো শুরু হয়। পরবর্তিতে মনির উদ্দিন নাভলু (ভ্যাট-ট্যাক্স অফিসার), শম্ভু নাথ সরকার (ক্যামব্রিয়ান স্কুলের শিক্ষক), আশরাফুজ্জামান সিয়াম (সহকারী সচিব পরিকল্পনা  মন্ত্রণালয়) ওনারা  যুক্ত হয়েছিলেন। ওনাদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় শিক্ষা প্রাঙ্গনের প্রথম ব্যাচ মাধ্যমিক পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়।পাঠাগারের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকির পর আমরা ১৪০ বর্গফুটের রুম নিলাম। কিন্তু জায়গার অভাব যাচ্ছে না। পাঠাগারের সদস্য সংখ্যা বেড়েই চলে। নতুন নতুন সদস্যদের দেখলে একদিকে খুশি হই অন্যদিকে শংকা তৈরি হতে থাকে এদের বসতে দিবো কোথায়? ১৪০ বর্গফুটের জন্য প্রত্যেক মাসে তখন ভাড়া গুণতে হচ্ছে ৪৫০০ টাকা। আবার বইও খুব বেশি নেই। বিশেষ করে বাচ্চাদের পড়ার উপযোগী বই নেই বললেই চলে। তখন আফজাল ভাই, রাসেল ভাই, রিয়াদভাইদের আর্থিক  সহযোগিতায় রুম ভাড়ার টাকা মোটামুটিভাবে ম্যানেজ করতে পারছি। বিশেষ করে রাসেল ভাই যে ভূমিকা রেখে চলেছেন গত ছয় বছর যাবত তা আমাদের জন্য বিশাল অবদান রেখেছে। আর বই সংগ্রহের জন্য বই মেলায় গিয়ে আমরা প্রকাশকদের নিকট বই চেয়েছিলাম। বেশ কিছু বই আমরা মেলা থেকে পেয়েছিলাম। আর শুভাকাঙ্ক্ষী, সুহৃদ, বন্ধুরা বেশ কিছু বই উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। আমরা আর্থিক দৈন্যদশা থাকা সত্ত্বেও চাঁদা তুলে বেশ কিছু বই কিনেছিলাম। এভাবে আমরা বইয়ের সংকট কিছুটা কাটিয়ে উঠেছিলাম।এসময়কালে কিছু লোক ছেলে-মেয়েদের একত্রে বসে পড়াশোনা করা, আড্ডা দেয়া, গান গাওয়া এর বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি তোলে। বিশেষ করে মেয়েদেরকে পাঠাগারে আসা যাওয়ার পথে উত্ত্যক্ত করতে থাকে। পাঠাগারের ছেলেদের তীব্র প্রতিক্রিয়ার পর এবং ফারজানা আক্তার মালার নেতৃত্বে কড়াইলে নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে আমরা দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করায় প্রতিক্রিয়াশিল শক্তি পিছু হটতে বাধ্য হয়। বিশেষ করে দুটি ধর্ষণ ঘটনায় পাঠাগার স্থানীয় মানুষদের যুক্ত করে ধর্ষকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুললে প্রশাসন ধর্ষকদের গ্রেফতার করে এবং কারাগারে পাঠায়। নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে এ দুটি আন্দোলন সদস্যদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। এর মধ্য দিয়ে কড়াইলে অতীত দিনে ২০/২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে ধর্ষনের স্থানীয় বিচার মিমাংসার রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। তিনবছর পার হওয়ার পর পাঠাগারের সদস্যদের সাথে স্থানীয় সাধারণ ছেলে-মেয়েদের সাংস্কৃতিক মানের পার্থক্য মূর্ত হয়ে ফুটে ওঠে। এবং তীব্রভাবে সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগ্রাম গড়ে উঠতে থাকে। এ প্রসঙ্গে  স্থপতি সাদিয়া শারমিন বিথি আপার পাঠাগারে আসার কারণটা উল্লেখ করতে চাই। তিনি কড়াইলে আসতেন গবেষণার কাজে। এসে মুনিয়া, নুসরাত ওদের সাথে পরিচয় হয়। ওনার ভাষায়, “ওরা ঠিক কড়াইলের অন্যান্য মেয়েদের মত নয়। ওদের কথা বলা চিন্তাভাবনার ধরণটাই একেবারে আলাদা। জিজ্ঞেস করলাম তোমরা কোথায় যাও বা কাদের সাথে মেশো। তখন ওরা আমাকে পাঠাগারের কথা বলে। এখানে আসার আমন্ত্রণ জানায়।” এভাবেই সাদিয়া আপা পাঠাগারের সদস্য হন। পরবর্তী কালে সাদিয়া আপার নেতৃত্বে পাঠাগারে ড্রয়িং শেখানো শুরু হয় এবং এ ড্রয়িং ক্লাস পরিচালনা, পরিকল্পনা এবং এর জন্য অর্থায়ন পুরোটাই সাদিয়া আপা করতেন বা এখনো করছেন।২০১৭ সালে এসে পাঠাগার ঘোষণা করে কড়াইলের কোনো শিশুর পড়াশোনা অর্থাভাবে বন্ধ হবে না। প্রয়োজনে পাঠাগার তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করবে। এ সময়ে পাঠাগারের সদস্য সংখ্যা অনেক বেড়ে যাওয়ার স্থান সংকুলানের জন্য আবারো বড় জায়গার প্রয়োজন তৈরি হয়। ২০১৮ সালে এসে আমরা ৮৪০০ টাকায় প্রায় ৩০০ বর্গফুটের একটি রুম নেই। পাশাপাশি ফ্রী একাডেমিক কোচিং এর জন্য আলাদা তিনটি রুম ভাড়া নেই ৮০০০ টাকায়। এই একাডেমিক কোচিং এর জন্য পাঠাগারে শহীদ রুমী শিক্ষা প্রাঙন নামে আলাদা বিভাগ খোলা হয়। ৫ম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত আমরা পড়ানো শুরু করি। ২০২১ সালে অবশ্য শুধুমাত্র ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। এখানে যারা শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তাদের প্রত্যেকেই পাঠাগারের সদস্য। কেউ উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ছে আবার কেউ সম্মান ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী। শিক্ষকদের বেশিরভাগই হলেন আমাদের একাডেমিক কোচিং এর প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী। সিয়াম ভাই, নাভলু ভাই, শম্ভুনাথ স্যারগণ যাদের পড়িয়েছিলেন, তারাই এখন শিক্ষক। পাঠাগার তাদেরকে গত ছয় বছরে সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গায় অন্তত অতটুকু উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছে। পাঠাগারের সদস্যরা স্বপ্ন দেখছে আগামীতে কড়াইলে একটা অবৈতনিক মাধ্যমিক স্কুল গড়ে তোলার। কারন অবৈতনিক প্রাথমিক স্কুল এখানে অনেক আছে কিন্তু মাধ্যমিক স্কুল এখানে একটাও নেই। আমরা স্বপ্ন দেখি সারাদেশে পাঠাগার আন্দোলন গড়ে তোলার। আমরা স্বপ্ন দেখি হাজার হাজার সামাজিক দায়বোধ সম্পন্ন মানুষ তৈরির আতুরঘর হবে পাঠাগারগুলো।করোনা পরবর্তি পরিস্থিতিতে জনজিবনে যে দূর্ভোগ নেমে এসেছে আমাদের পাঠাগারও সেখান থেকে মুক্ত নয়। ৮৪০০ টাকার জায়গায় রুম ভাড়া নামিয়ে নিয়ে এসেছি ৬০০০ টাকায়। কিন্তু এ টাকাটা জোগাড় করতে আমাদের নাভিশ্বাস উঠছে এখন। শিক্ষা প্রাঙনের জন্য নেয়া তিনটি রুম, ভাড়ার টাকা জোগাড় করতে না পারায় আমরা ছেড়ে দিয়েছি। পাঠাগারের জন্য স্থায়ী জায়গা কেনার জন্য করোনা বিপর্যয়ের আগে প্রায় এক লক্ষ টাকা সংগ্রহ করেছিলাম। এখন সে কাজটাও থেমে আছে। কিন্তু আমরা মনোবল হারাইনি। আমরা নিশ্চিত জানি এ দূর্বিষহ পরিস্থিতি আমরা খুব দ্রুতই কাটিয়ে উঠবো। যেই পুঁজি নিয়ে আমরা পাঠাগার শুরু করেছিলাম তা আমাদের এখনো অটুট আছে এবং আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে আর সেই পুঁজিটা হচ্ছে আমাদের বিশ্বাস আর দৃঢ় মনোবল। আমরা নিশ্চিত, আমরা পারবো, পারবোই।