কিছুদিন আগে একটা সংবাদ নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছিল। সংবাদটা ছিল “ঢাকায় দিনে ৩৯ তালাক “! এই সংবাদটা দেখে কেন জানি আমার নিজ সংসারে কথাই মনে হলো। সেদিন হাসপাতালে আমার একটা রঁন্দেভু ছিল। তাই সকাল সকাল বাচ্চাদেরকে তার বাবার দায়িত্বে রেখে আমি হাসপাতাল রওনা দিলাম। সারাদিন শারীরিক বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে এলাম প্রচন্ড মাইগ্রেনের যন্ত্রনা নিয়ে। ঘরে এসেই দিলাম একটা ঘুম। ঘুম ভাঙ্গতেই টের পেলাম আমার হাসব্যান্ড রান্নাবান্না সহ, সাংসারিক অন্যান্য সব কাজ করে ফেলেছেন। আর এতসব কাজ গুছিয়ে দিয়েই তিনিও তার নিজ কাজে বের হয়েছেন। এখন শুধু আমি বাচ্চাদের খাইয়ে ঘুমপাড়াবো।

যেহেতু করোনার কারণে আমার হাসব্যান্ডকে এখন ঘরে থাকতে হয়। তাই তিনি যতটুকু পারেন ঘর সংসারের সকল কাজে কর্মে অংশগ্রহণ করেন। এরজন্য তাকে কিছু বলতে হয় না। বরং আমি একটু অসুস্থ হলে বা দেরি করে ঘুম থেকে উঠলে তিনি আমাদের সবার জন্য নাস্তা রেডি করে রাখেন। আর এই কাজগুলি যে তিনি  শুধু আজ করেন, তা কিন্তু না। সংসার জীবনের প্রথম থেকেই ছুটির দিনগুলিতে ঘর সংসারে কাজ সহ সন্তান লালনপালন সকল কাজেকর্মে আমাকে পূর্ণ সহযোগিতা করেগেছেন। বরং কখনো কখনো আমি ছুটি দিনে বাচ্চাদের দায়িত্ব তাকে দিয়ে একটু ঘুমিয়েছি। আর তিনি ছোট বাচ্চাদের সামলিয়েছেন। তাদের সাথে খেলাধুলা করে সময় কাটিয়েছেন।

আবার, আমি যখন সুস্থ থাকি কিংবা তার শরীর খারাপ থাকে সেদিন তিনি অনেক দেরিকরে ঘুম থেকে উঠেন। কখনো কখনো দেরিকরে সকালের খাবার খেয়ে বাহিরে চলে যান বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে। সাথে হয়ত কিছু বাজার করেন। কিন্তু সে যাই হোক, সেদিন তিনি অনেকটা সময় বাহিরে নিজের মত সময় কাটিয়ে ঘরে ফিরেন। যদিত্ত ঘরে ফিরেই সংসারে কাজে ও সন্তানদের সময় দেন। হয়ত তাদের বিছনা ঠিক করে দেন। কখনো রাতের খাবারটা খাইয়ে দেন। কখনো কখনো আমিও আমার হাসব্যান্ডকে সংসারে সব দায়িত্ব দিয়ে বাচ্চাদের নিয়ে বান্ধবীর বাসায় চলে যাই আড্ডা দিতে। তখন তিনি আমাদের জন্য রান্নাটা করে রাখেন। আর এভাবেই আমরা দুইজন নিজেদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা আর সংসারে দায়িত্ব সবাই বন্টন করার চেষ্টা করে থাকি। হয়ত সংসার জীবনে এই স্বাধীনতা আর সমতার চর্চা না থাকলে আমাদের সংসার টিকতো না।

অথচ বাংলাদেশের পরিবার গুলি দিকে তাকিয়ে দেখি; সমাজে অধিকাংশ পুরুষ যেন বিয়ে করে বউ আনে না, আনে বিনা পয়সার একজন সেবা দাসী ! যিনি তার ও তার পরিবারের সেবার জন্য ২৪ ঘন্টা সদা প্রস্তুত থাকবেন! এমনকি কর্মজীবি নারীদেরও সংসার সন্তানের সকল দায় একা একা পালন করতে হয়। স্বামী বেচারি সারাদিন চাকরি করে বহু ক্লান্ত থাকেন, তাই তিনি কিছুই করতে পারেন না! অন্যদিকে স্ত্রীকে তার কাজের যথাযথ মূল্যায়নও করেন না। আর এই সব বৈষম্যের কারণে স্ত্রীরা স্বামীকে একটা শোষক পুরুষ ছাড়া অন্যকিছু ভাবতে পারেন না।  ফলাফল সংসারে মনোমালিন্য, ঝগড়াঝাঁটি।

অবশ্য এর দায়ভার শুধু পুরুষের একার তা বলবো না। কারণ নারীরাও নিজেদের সমস্যাটা বা চাওয়া পাওয়ার বিষয়টা স্বামীর কাছে ঠিক মত তুলে ধরতে পারেন না। সবসময় নিজেদের ভিতরে সকল চাপ নিয়ে হাসিমুখে সংসার ধরে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু ভিতরে ভিতরে রাগে অভিমানে ফুসতে থাকে। এর বিপরীতে আবার কিছু নারী আছেন যারা  বিয়ে করে ভাবেন, স্বামীকে একটা টাকা ভর্তি ব্যাংক এ্যাকাউন্ট ! ইচ্ছে হলেই বুথ থেকে টাকা তুলবে! আর ইচ্ছে মত খরচ করবে ! আর এমন চিন্তা ভাবনায় পার্থক্য থাকার কারণেই সংসারগুলিতে অশান্তি লেগেই থাকে। কেউ কেউ হয়ত ধৈর্য না ধরে বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যে ডিভোর্স দিচ্ছেন। কেউ কেউ হয়ত বহু বছর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে শেষে ডিভোর্স দিচ্ছেন। ডিভোর্স যে বেড়েগেছে এটা যেমন সত্যি। তেমনি সমাজে যে নারী পুরুষের মধ্যে প্রচন্ড বৈষম্য রয়েছে এবং এটা যে ডিভোর্সের অন্যতম কারণ সেটাও সত্যি ।

দেখুন বিয়ে একটা যৌথ জীবন যাপন পদ্ধতি। আর এটা দুই জন মিলেমিশে যাপন করতে হয় । সংসার করতে গেলে কাজের দায় দায়িত্বের বোঝা আসবেই, কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত কাজের বোঝা বা টাকার চাপ কখনোই কোনো সংসারে সুখ বয়ে আনে না। নারীদের যেমন উচিৎ না স্বামীকে চিপে, পিসে, নানা ধরনের ছলচাতুরি করে, মাত্রাতিরিক্ত চাহিদার বোঝা তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া। ঠিক তেমনি কোনো পুরুষের উচিৎ না বিবাহিত স্ত্রীকে দিয়ে সারাদিন রাত ২৪ ঘন্টা কাজের মানুষের মত কাজ করিয়ে, খাওয়া পড়ার খোটা দেওয়া। স্ত্রীর সারাদিনের সংসারে খাটুনি গুলিকে অবমূল্যায়ন করা।


অবশ্যই স্ত্রী ঘর সংসারে কাজ করবে কিন্তু নিজের উপরে জুলুম করে নয় নিশ্চয় ! অন্য দিকে স্বামীর টাকায় স্ত্রীর অধিকার আছে কিন্তু তা কতটুকু? নিশ্চয় স্ত্রী সকল দামী দামী শখ আহ্লাদ পুরন করতে স্বামী বাধ্য না। স্ত্রী যেমন  মাত্রাতিরিক্ত কাজের বোঝা নিয়ে সংসার করতে বাধ্য না। তেমন স্ত্রীর মাত্রাতিরিক্ত চাহিদা পূরণ করতে স্বামী বাধ্য না। তাই বিয়ে সময় দুইজনের উচিৎ নিজেদের চাওয়া পাওয়া গুলি নিয়ে আলোচনা করা। একই সাথে সংসারে কাজের বোঝা ও আর্থিক চাপ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া। সঙ্গীর মন ভালো রাখার জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকা। একে অপরের শরীর ও মনের যত্ন নেওয়া। ঘর সংসারে কাজগুলিকে যথাযথ মূল্যায়ন করা। নিজদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়টির দিকে নজর দেওয়া। মনেরাখবেন সংসার ধরে রাখার দায় স্কিন্তু বামী স্ত্রী দুইজনেরই সমান