রক্ত জমাট ফোলা ঠোঁট, কালচে চোখ, মুখে আঘাতের একাধিক চিহ্ন। সেই চিরচেনা হাসি হাসি মুখ নিয়ে এগিয়ে আসে সুলতানা। পাশে রাখা খালি চেয়ারটা টেনে নিয়ে সামনে এসে বসে।
“আপা থানায় যাব। মামলা করবো। কেমনে কী করতে হবে কইয়া দেন। ওই ব্যাটার লগে আর ঘর করতাম না। এবার হ্যারে জেলের ভাত খাওয়াইয়াই ছাড়ুম।”
আমার মুখ দিয়ে কোন আওয়াজ বের হয় না। রিভলভিং চেয়ার ঘুরিয়ে পেছনের ডেস্কে বসা জ্যেষ্ঠ সহকর্মীর মুখের দিকে তাকাই। তার চেহারায় স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। সুলতানাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আবার মেরেছে?”

একটা প্রশিক্ষণে সুলতানার সঙ্গে পরিচয়। পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে তখন সবেমাত্র এনজিওর চাকরিতে জয়েন করেছি। সুবিধাবঞ্চিত তরুণদের জন্য আয়োজন করা প্রশিক্ষণটা ছিল সচেতন নাগরিকতা বিষয়ে। প্রশিক্ষণের অন্যান্য অংশগ্রহণকারীর মধ্যে সবচেয়ে উচ্ছ্বল আর বাকপটু সুলতানাকে দেখে ঠিক তরুণ মনে হচ্ছিল না। আয়োজকদের কাছে জানতে চাইলাম ওকে বাছাই করার কারণ কী। বলা হলো অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছে। বাচ্চাকাচ্চাও অনেক। সংসারের চাপে তাপে চেহারায় বয়সের ছাপ পড়লেও আসলে ওর বয়স নাকি মাত্র ২৩।
প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীদের জড়তা কাটানোর অংশ হিসেবে প্রত্যেককেই নিজেদের জীবনের একটা আনন্দের ঘটনা আর একটা করে কষ্টের স্মৃতি বলতে বলা হলো। অবাক হয়ে ছেলে-মেয়েগুলোর কথা শুনছিলাম। কি স্বতঃস্ফূর্ত ওরা! কোন আড়ষ্টভাব নেই। ভাবছিলাম ওই বয়সে গলা দিয়ে ঠিক মতো আওয়াজই তো বের হতো না। আর এত ব্যক্তিগত কথা ঘরভর্তি মানুষের সামনে বলতে বললে ভাবতাম, কি ভাববে লোকে এসব বললে!
একে একে সবাই নিজেদের গল্পগুলো বললো। কেউ কেউ তার নিজের বা পরিবারের সংগ্রামের গল্প বলতে গিয়ে কেঁদে ফেললো। অদ্ভুত একটা বন্ধন তৈরি হয়ে গেলো যেন মুহূর্তের মধ্যে।
সুলতানার পালা যখন আসলো তখন সে আনন্দের স্মৃতি বলার পর বললো, “জীবনে কোন কষ্ট নাই। স্বামী-সন্তান নিয়ে আলহামদুলিল্লাহ সুখের সংসার।”

রাজধানীর যে এলাকাটায় সুলতানারা থাকে সেটা সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হলেও নিম্নবিত্ত মানুষের পাড়া হওয়ায় নাগরিক সুযোগ-সুবিধা প্রায় নেই বললেই চলে। রাস্তাগুলো এবড়োখেবড়ো। বৃষ্টি হলেই কোমড় পানি জমে যায়। সুয়ারেজ ব্যবস্থা তথৈবচ ফলে বৃষ্টির পানির সঙ্গে বর্জ্য মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
প্রশিক্ষণের পর একদিন আনন্দে উত্তেজনায় ছটফট করতে করতে সুলতানা অফিসে আসে। জানায়, এলাকার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নিয়ে রাস্তাটা পরিষ্কার করেছে। ইট, বস্তা ফেলে যাতায়াতের আপাতত ব্যবস্থা করেছে।
আরেকদিনের কথা। সুলতানা অফিসে এসেছে। সেদিনও আগের দিনের মতো খুশীতে জ্বলজ্বল করছে। জিজ্ঞেস করতে জানা গেলো, সন্ধ্যার পর থেকে ওদের গলিটা অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকতো। কোন আলোর ব্যবস্থা ছিল না। পাড়ার কিছু মাদকাসক্ত ছেলে সন্ধ্যায় বসে মদগাঁজা খেতো আর গার্মেন্টস বা কোচিং ফেরত মেয়েদের উত্ত্যক্ত করতো। যৌন হয়রানির ঘটনাও ঘটিয়েছে বেশ কয়েকটা। পুলিশকে জানিয়েছিলো। পাত্তা দেয়নি। দলবল নিয়ে স্থানীয় কমিশনারের কাছে গিয়ে দেনদরবার করে গলির মুখে আলোর ব্যবস্থা করেছে সুলতানা। আর স্থানীয় এক নেতাকে ধরে মাদকাসক্তদের আড্ডাটা শেষমেষ উঠিয়ে দিতে পেরেছে।
এলাকায় আগে থেকেই সুলতানা জনপ্রিয় ছিলো। যে কারও বিপদেআপদে সবার আগে সেই-ই ছুটে যায়। সাম্প্রতিক উদ্যোগের ফলে তার গ্রহণযোগ্যতা আরও বেড়েছে। কোন কাজের জন্য পাড়ার লোকদের ডাকলে সুলতানার কথা তারা ফেলতে পারে না। এনজিওর যেসব কর্মসূচীতে জমায়েতের দরকার হয়, সুলতানা তার বড় একটা অংশকে নিজের এলাকা থেকে এনে হাজির করে। প্রকল্পের আওতায় এলাকার বেশ কয়েকটা মেয়েকে সে সেলাই শিখতেও সহযোগিতা করেছে।

মামলা করতে, ডিভোর্স দিতে চাইলে কী কী করতে হবে বলে দেওয়ার পর সুলতানা ফিরে যায়। তাকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেয়া হয়। আপাতত বোনের বাসায় থাকবে বলে জানিয়ে গেলেও দেখেই বোঝা যাচ্ছিল ভেতরে ভেতরে ছটফট ছটফট করছে। বাচ্চাদের ফেলে এক কাপড়ে বাসা থেকে বেরিয়ে এসেছে বলে হয়তো।
ও চলে যাওয়ার পর সহকর্মীদের কাছে বিস্তারিত জানতে চাইলাম। প্রেম করে অল্প বয়সে পালিয়ে বিয়ে করেছিল। পরিবার প্রথমে মেনে নেয়নি। স্বামী জুয়ারী ও গাঁজাখোর-মদ্যপ। কোন কাজেই বেশিদিন টিকতে পারে না। বেশিরভাগ সময় ঘরে শুয়ে-বসে কাটায়। সুলতানাকেই নানান উপায়ে আয়-উপার্জন করে সংসার চালাতে হয়। কাজ করার জন্য চাপ দিলে বা জুয়ায় হেরে, টাকা চেয়ে না পেলে প্রায়ই সুলতানাকে স্বামী মারধোর করে।
সুলতানার গল্প শুনতে শুনতে আমার মনে পড়ে যায় এক প্রতিবেশীর কথা। প্রায় মাঝরাতে তার কান্না আর চিৎকারের শব্দ শুনতে পাই। অনলাইনে ব্যবসা করা স্বাবলম্বী সেই নারী ব্যাংকার স্বামীর হাতে প্রায় রাতেই মারধোরের শিকার হয়। পুরো এলাকা জানে সে ঘটনা। একদিন তার কাছে গিয়ে যখন জিজ্ঞেস করলাম, ডিভোর্স করছেন না কেন? খুব বিরক্ত হয়েছিলো।
“একা একা বাচ্চা নিয়ে এ শহরে একটা ডিভোর্সি মেয়ের টিকে থাকা কতটা কষ্টের আপনি কি করে জানবেন? বাবা বেঁচে থাকলে তাও হয়তো… যাই হোক, গায়ে পড়ে এভাবে অযথা কারও সংসার ভাঙতে উসকানি দেবেন না।”

কিছুদিন পর সুলতানা আবারও আসে। ততদিনে ক্ষতের দাগ মুছে গেছে চেহারা থেকে। সেই একই হাসি হাসি চেহারা। হাতে একটা পেপারকাটিং। আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো।
“দেখেন আপা, পত্রিকায় আমারে নিয়ে লিখসে! ছবিও ছাপসে।”
নামকরা দৈনিকে নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ক একটা ফিচার পাতায় সুলতানাকে নিয়ে করা প্রতিবেদনের শিরোনাম-“যৌন হয়রানি ঠেকানো সাহসী সুলতানা”।

সুলতানা ডিভোর্স দেয়নি। মামলাও করেনি স্বামীর বিরুদ্ধে। ৪-৫ দিন বোনের বাড়ি থেকে ফিরে গিয়েছিলো। ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে গলির মুখে একটা মুদির দোকান করে দিয়েছে স্বামীকে। যাওয়ার আগে বার বার করে বলে গেলো আমরা যেন একবার ওর বাসায় যাই। আমরা গিয়ে তার স্বামীকে একটু শাসিয়ে দিয়ে আসলে নাকি সে ‘টাইট’ থাকবে। সে নিশ্চিত যে এবার তার স্বামী থিতু হবে।
আমরা সহকর্মীরা একে-অন্যের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম।
হাসি হাসি মুখ নিয়ে ফিরে গেলো সুলতানা। আমার কাজে মন বসছিলো না। ডেস্কের ওপর এক তাড়া কাজ জমে আছে। আছে ডেডলাইনের চাপ। অফিস টাইম শেষ হতে বেশ খানিকক্ষণ বাকি।
জানলার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। পাশেই একটা সরকারি স্কুলের মাঠ। একদল কিশোর ক্রিকেট খেলছে। মাঠটা কিছুদিন আগ পর্যন্ত খেলার অনুপযুক্ত ছিলো। ছেলেগুলো নিজেরাই টাকা তুলে মাঠটাকে ঠিকঠাক করে নিয়েছে। মিনিট কয়েক ওদের খেলা দেখে মন শান্ত হলো। ডেস্কে ফিরে কাজে মন দিলাম।