দেশে একদিকে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ জারি আছে, যাতে নারীর বিয়ের ন্যূনতম বয়স হলো ১৮ বছর। সম্প্রতি আদালতের নির্দেশ ও অভিভাবকের সম্মতির মাধ্যমে ১৮ বছরের কম বয়স্ক নারীর বিয়ে পড়ানোর একটা বিধান যোগ করা হয়েছে আইনে। তবে, এটা ব্যতিক্রমমাত্র।

অন্যদিকে, মুসলিম-হিন্দু উভয় ধর্মীয় আইনানুসারে ১৮ বছরের কম বয়সের নাবালিকাদের বিয়েতে বাধা নেই। বিয়ে পড়ালে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বটে, কিন্তু বিয়েটা অবৈধ হবে না।

মুসলিম বিয়ে পূর্ণাঙ্গ হতে আবার যৌনসম্পর্ক স্থাপনের (consummation) আবশ্যকতা আছে। দেনমোহর, ভরণপোষণ, ইদ্দতকাল ইত্যাদি বিষয়ে বর-কনের বিভিন্ন অধিকার/বাধ্যবাধকতা পূর্ণরূপ পেতে যৌনসম্পর্ক স্থাপনের বাধ্যবাধকতা থাকে। স্ত্রী যদি বৈধ কারণ ছাড়া যৌনসম্পর্ক স্থাপনে অস্বীকৃতি জানান তবে স্বামী তার ভরণপোষণ দিতে অস্বীকার করতে পারেন। আর যে কোন সময়, কোনো কারণ ছাড়াই স্ত্রীকে তালাক দেয়ার অবারিত ক্ষমতা তো মুসলিম স্বামীদের থাকেই।

ফলে, স্পষ্ট আইন ছাড়া নাবালিকা স্ত্রীর সাথে যৌনসম্পর্ক স্থাপন থেকে স্বামীকে বিরত রাখার সুযোগ থাকছে না একটি ব্যতিক্রম ছাড়া। সেটি হলো- বরটিকে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে সাজা দিয়ে জেলে পাঠিয়ে দেয়া। এর আবার নানান পারিপার্শ্বিক বিপত্তি থাকে। বিয়ে, একটি সংসার, মন ভাঙা মসজিদ/মন্দির ভাঙার সমান- এসব বিষয় সামনে আসলে আমাদের আইন, সমাজ, রাষ্ট্র, ব্যক্তি সকলেই দ্রবীভূত হয়ে যান।

অথচ, বিদ্যমান আইনে বৈবাহিক ধর্ষণ (marital rape) এর বিধান নেই ১৩ বছরের কম বয়সের বালিকা না হলে। ফলে, ১৩ বছরের বেশি বয়সের বিবাহিত নাবালিকার কোনো আইনি সুরক্ষা আপাতত নেই।

আইনের এই রকমের ত্রিশঙ্কু অবস্থা হলে নুর নাহার’দের “বৈবাহিক ধর্ষণজনিত মৃত্যু”র দায়ভার তার ‘দুবাইওয়ালা’ বর, বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, বিয়ে পড়ানো ও নিবন্ধনকারী, বিয়ের সাক্ষীগণের সাথে সাথে খোদ আইনের কাঁধেও বর্তায়। গ্রামের দফাদারসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার বাল্যবিবাহ নিরোধ সম্পর্কিত আইন ও জনশৃংখলা রক্ষার জন্য সরাসরি দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদেরও চাইলে কিঞ্চিৎ জবাবদিহির আওতায় আনতে পারেন তাদের বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা দরকার যে, অক্টোবর/২০২০ এ টাংগাইলের বাসাইলে ৩৪ বছর বয়স্ক প্রবাসী ও ধনী বর রাজিব খানের সাথে বাল্যবিবাহের অল্প কিছুদিনের মাথায় যৌনাঙ্গের রক্তক্ষরণে মারা যাওয়া ১৪ বছরের অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী হলেন আলোচ্য নুর নাহার।

বৈবাহিক ধর্ষণের আইন করার একটা দাবি নারী অধিকার কর্মীরা তুলে আসছেন অনেকদিন ধরেই। নুরনাহারের করুণ মৃত্যু এর বাস্তবিকতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। তাসত্ত্বেও, বাংলাদেশের রক্ষণশীল আর্থসামাজিক বাস্তবতায় কিছু সিরিয়াস গবেষণা ও বিতর্কের মাধ্যমে প্রকৃত অবস্থা সুচিহ্নিত করার পরই বৈবাহিক ধর্ষণের আইন করা উচিত বলে মনে করি। কারণ সম্মতি ছিলো, কি ছিলো না, এটা মূলতঃ স্ত্রীর মুখের কথা আর কিছুটা পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের উপর ভিত্তি করেই প্রমাণ করতে হবে। অন্য কোনো সাক্ষী পাওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। ডিএনএ বা অন্যান্য ডাক্তারি পরীক্ষাও খুব বেশি কাজে আসবে বলে মনে হয় না।

কারো মুখের কথায় অপরাধ আমলে নেয়া বা কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় তখন, যখন অভিযোগকারীকে ১০০% বিশ্বাস করা যায় যে, তিনি সত্য বলছেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন, যৌতুক নিরোধসহ অন্যান্য পারিবারিক আইনের অভিজ্ঞতা ও সামাজিক বাস্তবতা মিলিয়ে ভিক্টিম স্ত্রী হলেও তার স্রেফ মৌখিক সাক্ষ্যকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করাটা কঠিনই বলা চলে। দৃশ্যতঃই বৈবাহিক ধর্ষণ এমন একটা অপরাধ যা প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব না হলেও বেশ শক্তই বলা চলে, যদি না স্বামীটি দোষ স্বীকার করেন অথবা নুরনাহারের মতো অভাবনীয় নিষ্ঠুরতার শিকার না হন। যেসব দেশে বৈবাহিক ধর্ষণ অপরাধ বলে স্বীকৃত সেখানেও এই বিচারজনিতঃ অসুবিধা ও অন্যান্য সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক কারণে মামলা/বিচারের হার বেশ কম।

তবে, বৈবাহিক ধর্ষণের আইনগত স্বীকৃতি আছে- এটাও একধরনের অর্জন বলে গ্রহণ করা হয়। আইন, বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থা আছে- এই বোধটাও সম্ভাব্য ভিকটিমদের সাহস আর হবু অপরাধীদের সতর্কবার্তা দেবে। কিন্তু এমন সংস্কার আনাটা খুব সহজ নয়।

শরিয়া/শাস্ত্রীয় আইনের ব্যত্যয় ঘটবে বলে নাবালিকার বিয়েকে সরাসরি অবৈধ ঘোষণা করে আইন করা আপাতত সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। গুরুতর ও স্পর্শকাতর ব্যাপার বলে এতে হাত দেয়া যাবে না বলে মানা গেলো। কিন্তু, কনের বয়স ১৮ না হওয়া পর্যন্ত যৌনসম্পর্ক স্থাপন করা যাবে না, করলে তা বৈবাহিক ধর্ষণ বলে গণ্য হবে- এটা শরিয়া/শাস্ত্র লংঘন না করেও করা যায়। তবে, সতর্কতা হিসেবে মৃত্যু বা শারিরীকভাবে অক্ষম না হলে কেবল কনে ছাড়া অন্য কেউ এ নিয়ে অভিযোগ করতে পারবেন না- এমন বিধান রাখা যেতে পারে। এছাড়া, এমন ক্ষেত্রে দণ্ডের মাত্রাও অপরাধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে হবে।

এটা করা গেলে প্রবাসী বর যাদের স্বল্পকালীন ছুটিতে এসে সব দ্রুত সেরে আবার বিদেশ ফেরার তাড়া থাকে, তারা সাধারণতঃ বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে যাবেন না। দেশবাসী বরদের ক্ষেত্রেও এটা কাজ করতে পারে।

আরেকটা কাজ করা যেতে পারে, তা হলো, বিয়েতে বর-কনের বয়সের ব্যবধানের একটা সিলিং নির্ধারণ করে দেয়া যেতে পারে। সর্বোচ্চ ৫/৬ বছর হতে পারে সেটা।

তবে, মানবিক সম্পর্ক তো কেবল বয়সের ফ্রেমে বেঁধে রাখা যায় না। তাই সিলিং এর বেশি বয়সের পার্থক্যও অনুমোদনযোগ্য হতে পারে। এজন্য বর-কনেকে কী কী পারিপার্শ্বিকতার প্রেক্ষাপটে তারা সিলিং অতিক্রম করে বিয়ে করছেন, তা বয়ান করে একটা যৌথ হলফনামা দাখিল করার বিধান রাখা যেতে পারে, যা কাবিননামার অংশ বলে গণ্য হবে।

আইন যতোই করা হোক না কেনো, যাদের জন্য ও যারা প্রয়োগ করেন তাদের আন্তরিক মিথস্ক্রিয়া ছাড়া তা ফলপ্রদ হয় না। বাল্যবিবাহ কেনো দেয়া হয়? প্রধান দু’টি কারণ হলো- দারিদ্র্য আর কন্যাশিশুর ইভটিজিং, উঠিয়ে নেয়া, ধর্ষণের মতো সহিংসতার শিকার হওয়ার আশংকা থেকে আগেই মেয়ের একটা গতি করার ইচ্ছা থেকে। সুশাসন, আর্থিক সুরক্ষা ও নাগরিকের নিরাপত্তার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে নেয়ার মাধ্যমেই কেবল এসব আর্থসামাজিক অবস্থার উত্তরণ ঘটানো সম্ভব। রাষ্ট্র-সমাজকে এসব দায়িত্ব ঘাড়ে নিতেই হবে। না হলে, কোন আইনই সফল হবে না।