জীবন থেকে মূল্যবান আড়াই ঘন্টা সময় নষ্ট করে কাসেম বিন আবুবাকারের একটা বই পড়লাম। বইয়ের নাম ‘কি পেলাম’।


কাসেম বিনের হালকা পরিচয় দিয়ে শুরু করি। তার উপন্যাসের মূল বিষয় ইসলামকেন্দ্রিক প্রেম-ভালোবাসা। আরেকটু গুছিয়ে বললে, ইসলাম এবং প্রেম-ভালোবাসাকে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে সুড়সুড়ি দেওয়া। তিনি আধুনিক এবং শহুরে পাঠকসমাজের কাছে খুব একটা পরিচিত এবং পঠিত না হলেও প্রবীণ পাঠকদের কাছে তিনি ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছেন।


কাসেম বিনের লেখার ধাঁচ বোঝার জন্য তার বই থেকে দুটো উদাহরণ দিচ্ছি।
“শফিক বিসমিল্লা বলে শফিকুনের ঠোটে কিস করা শুরু করলো।”
“রফিকুন বোরখা পড়ে ডেটিংয়ে যায়, কারণ বোরখা ছাড়া ডেটিং নাজায়েজ।”
.
কাসেম বিন আবুবাকার ১৯৭৮ সালে প্রথম উপন্যাস ‘ফুটন্ত গোলাপ’ লেখেন। ‘ফুটন্ত গোলাপ’ পাণ্ডুলিপি লেখার পরে তিনি তা প্রকাশের জন্য প্রকাশক পাচ্ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত ১০০০ টাকায় বইটির স্বত্ব বিক্রি করে দেন। প্রায় আট বছর পর বইটি প্রকাশ হয়, এবং তখনই বইটি ‘বেস্ট সেলার’ হয়।

কাসেম বিন আবুবাকার জানিয়েছেন, পাঠক যেন শরীয়ত সম্মত উপায়ে সুন্দর ইসলামী জীবন-যাপন করতে পারে সে উদ্দেশ্য নিয়ে উপন্যাস লিখেন।হুমায়ুন আহমেদের বই যে পরিমাণ বিক্রি হয়েছে তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি পরিমাণ বিক্রি হয়েছে কাসেম বিন আবুবাকারের বই। তার লেখা ‘ফুটন্ত গোলাপ’ বিক্রি হয়েছে দশ লক্ষাধিক কপি। হুমায়ুন আহমেদের কোনো বই-ই এত পরিমাণ বিক্রি হয়নি।


এক্ষেত্রে আরেকটি বইয়ের কিছু লাইনও শেয়ার করছি।
বই থেকে
সাবিহা বাবুজীর কথা শুনে আনন্দে মোহিত হয়ে নিজেকে সামলাতে পারছে না।
” এবার হাত ছাড়ুন, পানি খাবেন বললেন”
কায়সার হাত না ছেড়ে গালে চেপে ধরে বলল, “আপনার নরম হাতের ছোঁয়ায় ও আপনার মধুর কণ্ঠের কথা শুনে এবং সর্বোপরি আপনার রূপসুধা পান করে আমার পিয়াস মিটে গেছে। সত্যি, যিনি আপনার নাম রেখেছেন তিনি ধন্য। আপনার নামের অর্থ নিশ্চয়ই জানেন?”
সাবিহা আরো বেশী লজ্জা পেয়ে কথা বলতে পারল না। কেঁপে উঠে না সূচক মাথা নাড়ল।
কায়সার বলল, “সাবিহা অর্থ সৌন্দর্যময়ী। আল্লাহ্ পাক সত্যি সত্যি আপনাকে সৌন্দর্যের রানী করে তৈরি করছেন। আপনার নাম সার্থক”
বাবুজীর কথা শুনতে শুনতে সাবিহা ক্রমশ লজ্জা বেশী পেয়ে মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে। সমস্ত শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে। কোন রকমে বলল, “প্লীজ ছাড়ুন। বাবার নামাজ পড়া হয়তো এতক্ষণে শেষ হয়েছে, এবার এসে পড়বে”
কায়সার তার দুটো হাতের তলায় চুমো খেয়ে ছেড়ে দিয়ে বলল, আল্লাহ্ তুমি আমার মনের বাসনা পূরণ করো।
.
এখন পর্যালোচনা করবো আমার পড়া ‘কি পেলাম’ বইটি নিয়ে। প্রথমেই সন্দেহ জানাচ্ছি বইয়ের নাম নিয়ে। আমরা জানি যে, যেসব প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ বা না দ্বারা দেওয়া যায়, সেসব প্রশ্নে ‘কি’ ব্যবহৃত হয়।


আর যেসব প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ বা না দ্বারা দেওয়া যায় না, অর্থাৎ ডিটেইলস উত্তর, সেসব প্রশ্নে ‘কী’ ব্যবহৃত হয়। সেক্ষেত্রে বইয়ের নাম ‘কি পেলাম’ না হয়ে ‘কী পেলাম’ হলে শুদ্ধ হতো বলে আমার ধারণা। তবে, যেহেতু এটি বইয়ের নাম, এবং নামের ক্ষেত্রে সব বানানই এক্সেপ্টেবল, এর শুদ্ধতা নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছি না।


বইটির অংশবিশেষ তুলে দেবার আগে চরিত্রের বর্ণনা দেওয়া উচিত। সংক্ষেপে বলছি।
হারুন নামের এক ছেলে বিদেশে চাকরি করে। দেশে ছুটিতে আসার পর এক বন্ধুর বিয়েতে রোকেয়াকে দেখে ভালো লাগে। ঘটনাক্রমে তাদের বিয়ে হয় এবং এই বিয়েতে হারুনের মা হনুফা বিবি বেজায় অখুশি। ইচ্ছামতো সে রোকেয়াকে গালমন্দ করে, আর রোকেয়া এসব দেখে কাঁদে। এদিকে হারুন তার বউকে ভালোবাসে, আবার মায়ের মুখের উপরও কিছু বলতে পারে না ৷


বই থেকে
একদিন বউকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি গেলো হারুন।
সন্ধ্যায় ফিরে আসতেই তার মা চিৎকার করে বললো,
“মাকে বাঁদীগিরি করতে দিয়ে বৌ নিয়ে সারাদিন ঘুরে বেড়িয়ে আমোদ ফুর্তি করে এলি। আল্লাহ- এর বিচার করবে..”
হারুন মায়ের কথায় রাগ করলো না। মাকে বললো, “সংসারে কাজ করলে কেউ বাদী হয়না। বরং বাদীগিরি করার জন্য রোকেয়াকে বিয়ে করে এনেছি…”
সময় গড়িয়ে যায়। রোকেয়া একসময় গর্ভধারণ করে।

বই থেকে
হনুফার বাবা আনসার উদ্দিন পারিবারিক আড্ডায় বলেন, ” আল্লাহ যদি মেয়ে দেন, তাহলে তার নাম রাখবে আশা “
সবাই হেসে উঠল। একজন প্রশ্ন করল, “এত নাম থাকতে আশা কেন?”
“কেন রাখতে বললাম, শোনো। আশা যখন বিয়ের লায়েক হবে তখন সব ছেলেরা আশা করবে আশাকে বিয়ে করব, বুঝেছ?”
“আর অন্য নাম রাখলে করবে না বুঝি? “
“তুমি এখনো ছোট। তাই আমার কথার মানে বুঝতে পারছ না। বড় হলে বুঝবে ওই নাম রাখলে সবাই বেশি আগ্রহী হবে….”
.
কাশেম বিন আবু বাকার কে আমার শুধু একজন ঔপন্যাসিকই মনে হয়নি, বরং ক্রিয়েটিভ রাইটার হিসেবেও বেশ ধারালো মনে হয়েছে। এই ধারনা আরও পাকাপোক্ত হয়েছে তাঁর উপন্যাসে বর্ণিত চিঠি গুলি পড়ে। বই থেকে উদ্ধৃত করছি অংশবিশেষ,
হারুন দুবাই পৌঁছে রোকেয়াকে চিঠি দিল।
রোকেয়া চিঠি পেয়ে পড়তে লাগলো –
“ওগো আমার প্রাণ হরিণী,
কোন সুদূরে আছো তুমি? তোমাকে প্রথমেই জানাই আন্তরিক দোয়া ও ভালোবাসা। আর তোমার নরম ঠোঁটে আমার গরম চুমু পাঠালাম। ঠান্ডা হতে দিও, কিন্তু তাড়াতাড়ি নিও…. ” ****
বইতে আরও বিভিন্ন ইন্ট্রেস্টিং, শিহরণ জাগানো জায়গা বর্ণনা করার মতো আছে। করছি না কারণ আমার এই পর্যালোচনা তখন পাহাড় সমান হয়ে যাবে।
.
কাসেম বিন আবুবাকার পশ্চিবঙ্গের হাওড়া এলাকা থেকে বাংলাদেশে আসেন ১৯৬৮ সালে। নিউমার্কেটের মল্লিক ব্রাদার্সে কাজ শুরু করেন। বইয়ের দোকানে থাকতে থাকতেই লিখতে শুরু করেন। সেই লেখা ইসলামি প্রেমের উপন্যাস হিসেবে বাজার সয়লাব হয়ে যায় আশির দশকে।
‘বাংলাদেশে কীভাবে এলেন?’ এই প্রশ্নের উত্তরে ২০১৭ সালে ‘চট্টগ্রাম ডেইলি’ পত্রিকাকে তিনি জানান,
“বাংলাদেশে আসার ব্যাপারটা বললে কে কীভাবে নেবে আমি ঠিক জানি না। তবে বলতে দ্বিধা নেই। বাংলাদেশ বা তৎকালীন পাকিস্তানে আসার জন্য আমি স্বপ্নে আদিষ্ট হই। ফুরফুরা পীর সাহেবকে আমি স্বপ্নের কথা বললে তিনি বাংলাদেশে আসতে বলেন”
.
২০১৭ সালের ২৬ শে এপ্রিল AFP তাকে নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, “𝐈𝐬𝐥𝐚𝐦𝐢𝐜 𝐫𝐨𝐦𝐚𝐧𝐜𝐞 𝐧𝐨𝐯𝐞𝐥𝐬 𝐬𝐞𝐭 𝐡𝐞𝐚𝐫𝐭𝐬 𝐚𝐟𝐥𝐮𝐭𝐭𝐞𝐫 𝐢𝐧 𝐁𝐚𝐧𝐠𝐥𝐚𝐝𝐞𝐬𝐡”
এরপরেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমসহ বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোও তাকে নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে। যদিও কাসেম বিন আবুবাকার বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন তার পরিচিতি কিংবা টাকা-পয়সা নিয়ে মাথা-ব্যথা নেই৷ তিনি বিশ্বাস করেন, তার বই পড়ে অশালীন ছেলে-মেয়েরা শালীন প্রেমের উপায় খুঁজে পেয়েছিল। ইসলামের পথে এসেছিলো।
আরেক সাক্ষাৎকারে তাকে প্রশ্ন করা হয়,
“আপনার কিছু পাঠকের কথা শোনা যায়, তারা রক্ত দিয়ে চিঠি লিখে, বিয়ে করতে চায়। এসব কী সত্যি?”
তিনি জানান,” হ্যাঁ। এমন তো অনেকবারই হয়েছে। একবার রাজশাহী থেকে চারটি মেয়ে একসঙ্গে তাদের ছবি ও জীবনবৃত্তান্ত পাঠায়। তারা লেখে, আমাদের যাকে আপনার পছন্দ তাকে আপনি বিয়ে করুন। তবে, পরে যখন জানতে পারে আমি বয়োবৃদ্ধ পরে আর যোগাযোগ করে না কেউ…. “