মফস্বলে বেড়ে ওঠা আমি বয়ঃসন্ধিতেই বুঝে গেছিলাম শ্লীলতা আর অশ্লীলতা মানুষের মগজে, দৃষ্টি ভঙ্গিতে, নব্বই শতাংশ মানুষের জাজমেন্টাল মেন্টালিতে বাস করে। কারো পোশাকে অথবা চাল চলনে নয়। পাবনায় আমি যে গার্লস স্কুলে পড়তাম অথবা প্রাইভেট ব্যাচে পড়তাম ওখানে ৯৯% মেয়ে বোরখা পরতো এক আমি বাদে। সুতরাং তাদের চোখে আমিই ছিলাম অশ্লীল! অথচ আমার কখনো মনে পড়ে না আমি পাবনাতে কখনো ওড়না ছাড়া বাড়ির বাইরে বের হয়েছি। প্রথম কিছু দিন সালোয়ার কামিজ পরেছি তারপর ওড়না সহ জিন্স, ফতুয়া, লম্বা টপস এগুলোই বেশি পরতাম। তারপরও শুনতে হয়েছে যে আমার পোশাক খারাপ!


আমার প্রিয় পোশাক শাড়ি। আমি কারনে, অকারণে, ঘরে বাইরে শাড়ি পড়তে ভালোবাসি। বিয়ের আগেই আমার শাড়ির সংখ্যা ছিলো ২০/২৫ টা। আর বিয়ের পর তা গিয়ে পৌঁছেছে ৩৫ টাতে অথবা আরও বেশি। আমি খুব ছোট বেলা থেকেই খুব মায়া দিয়ে গুছিয়ে শাড়ি পরতে পারতাম। জামাই বলে একদিন আমাকে টাঙ্গাইলের শাড়ির হাটে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেবে। যত মন চায় আমি যেন শাড়ি নেই। আমি অল্পতেই তুষ্ট। আমি শুধু শাড়ি পেতেই না উপহার হিসেবে দিতেও ভালোবাসি।

অনার্সে ওঠার পর আমার খুব শখ হলো একদিন কালো সিল্কের একটা শাড়ি পড়বো কালো স্লিভলেস একটা ব্লাউজ দিয়ে। শখ থাকলেও তা আমার সাহসে কুলালো না কখনোই। শাড়ি পরার ক্ষেত্রে আমার এই একটাই আক্ষেপ থেকে গেল সারাজীবনের জন্য । তার মূল কারণ আমার হাতের বাহু। আমার শরীরের একমাত্র খুঁত! যা আমি ফুল হাতা ব্লাউজের নিচে সবসময় ঢেকে রেখেছি। কখনো একটু ছোট হাতার জামা পরলেও আমাকে সবসময় শুনতে হয়েছে আমার হাত নাকি অস্বাভাবিক মোটা! কমেন্ট পাস কারি একটা কমেন্ট ছুড়ে একবারের জন্য ও চিন্তা করতো না এই কথাটা কিভাবে আমার বুকে এসে বিধতো! আমি নিজেকে ফিট রাখার জন্য বারো মাস ডায়েট করতাম অথবা নিজেকে মেইনটেইন করতাম। রিকশা নিতাম না সব জায়গায় হেঁটেই যেতাম। সামান্য কিছু মিষ্টি খাবার অন্য কাওকে যতনা ধরতো কোনো কারন ছাড়াই আমাকে তার দ্বিগুন ধরতো। দুইদিন পরপর ভাত খেলেই আমার ওজন দুই কেজি হুট করে বেড়ে যেত!


যখন আমি অনার্স ফাস্ট, সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি তখন আমার ওজন ৫৬/৫৭ এর মতোন ছিলো সে সময় একবার একটা স্লিভলেস ব্লাউজ বানিয়েছিলাম। কিন্তু কখনো পরা হয়নি। সেটা পরে কোথাও বেড়াতে যাবো লোকে হয়তো বাজে ভাবে তাকিয়ে থাকবে, তা থাকুক তাতে আমার কিছু যায় আসে না কিন্তু ঐ যে দুটো ছবি তুলবো ফেসবুকে আপ দিবো। তারপর আমার ফুফাতো বোনের চাচাতো ভাই এর গার্লফ্রেন্ড তা দেখবে। আরো পাঁচ কান ঘুরে তা আমার মায়ের কানে আসবে “ঊষা নষ্ট হয়ে গেলরে” এই শিরনামে। আম্মু আমাকে হয়তো কিছু বলতে আসবে না কিন্তু মনে মনে কষ্ট পাবে। এই জন্য আর তা আর হয়ে উঠলো না। এমনিতেই আমার নামে এতো কথা চারিদিকে তাই আর বাড়ালাম না। এখন তো বিয়ে হয়ে গেছে। আমার কোনো কাজের দায়ভার গিয়ে আমার মায়ের উপর চাপবে না। এদিক দিয়ে চিন্তা করলে আমি এখন আগের চেয়েও স্বাধীন। পিয়াসকে যদি কেও আমার পোশাক, ফেসবুক অথবা ফ্রেন্ড সার্কেল নিয়ে কিছু বলতে আসে পিয়াস তাকে এক ধমকে হাগায় মুতায়ে ফেলে এমনকি সে এই কথা কখনোই আমার কান পর্যন্ত কখনোই এসে পৌঁছোয় না। কিন্তু আক্ষেপ এখন আমি আর আমার মন মতো কিছুই পরতে পারি না। অথবা আমাকে আর আগের মতো কিছুই মানায় না।


না আমার বয়ফ্রেন্ডের জন্য , না আমার হাসবেন্ড এর জন্য। আমি নিজেকে আকর্ষণীয় রাখার চেষ্টা করতাম যেন আয়নায় নিজেকে দেখলে শান্তি লাগে। যেন একটা সেল্ফি তুললে নিজেকে কোন এঙ্গেল থেকে শুকনা লাগে সেটা না খুঁজে বের করতে হয়। যেন ছবি তোলার সময় তলপেট দম চেপে না ধরে রাখতে হয়। যেন নিজেকে সুন্দর দেখলে নিজে থেকে নিজের জন্য একটা আত্মতৃপ্তির মৃদু নিঃশ্বাস বের হয়ে আসে।

আপনারা বডি শেমিং করেন। কি মজা পান বলেন তো? নিজের দিকে একটা বার তাকিয়ে দেখুন আপনি কি পার্ফেক্ট? একদম ফিট? না। পৃথিবীতে কেও পার্ফেক্ট না। কেও কালো, কেও ফর্সা, কেও মোটা অথবা শুকনা। কেও বা একটু বেশিই খাটো! এরেন্জ ম্যারেজ করতে গিয়ে একটা বিষয় ভালো মতোন বুঝেছি বডি শেইমিং এর সবচেয়ে বড় শিকার হয় মেয়েরা। ছেলে যেমনই হোক এটা কোনো বিষয় না। মেয়ে চাই পুতুলের মতোন তুলতুলে, নমনীয়, সুন্দরী। সাথে আবার শিক্ষিত! আর যৌতুকের কথা তো বাদই দিলাম। এ দিক থেকে আমি বেচে গেছিলাম। আমার বিয়ের ডেট পর্যন্ত ফিক্সড হয়ে গেছিলো কিন্তু পিয়াস ছাড়া কেও আমাকে একবারের জন্য চোখের দেখা পর্যন্ত দেখেনি। তারা কেবল আমার ছবি দেখে এবং আমার আব্বুর সাথে কথা বলে বিয়ের কথা পাকা করে ফেলেছে।


যাই হোক, বডি শেইমিং এর ব্যাপারে যেটা বলছিলাম সেখানে ফিরে আসি। বিয়ের পর আমি আশীর্বাদের মতোন যে জিনিসটা পেলাম তা হলো আমার শাশুড়ী। উনি তার ছেলের বউকে প্রচন্ড রকম ভালোবাসেন। আর তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে আমাদের খাবার টেবিলে। উনি আমাকে সবসময়ই মাছের বড় টুকরো টা মাংসের বড় পিস টা পাতে তুলে দেয়ার চেষ্টা করেন। ভাত শেষ হতে না হতেই আবারও পাতে ভাত তুলে দেন। আমি নিজের হাতে নিলে তার পছন্দ হয়না। একটু কম খেলেই তার মনে হয় আমি কোনো করানে রাগ করছি ইত্যাদি ইত্যাদি। এছাড়াও আমি হঠাৎ অসুস্থ থাকলে (পিরিয়ড ) তিনি দিনের মধ্যে কয়েকবার আমার ঘরে এটা ওটা পাঠাতেই থাকেন। এভাবে তিন মাসে আমার ফুড হ্যাবিড পুরাটাই কেমন নষ্ট হয়ে গেল! আগে আমি ভাত খেতাম তিন দিনে একবার! আর এখন আমি ভাত খাই দিনে তিনবার! আগে আমি যতদূরই যাই হেটে যাওয়ার চেষ্টা করতাম আর এখন বাড়ি থেকে বের হয়েই গাড়ি, আর গাড়ি থেকে নেমেই বাড়ি। সুতরাং আমার ওজন বেড়ে গেল ১৩ কেজি! বডি শেইমিং এর শিকার হতে হলো আমাকেও। আমারই বন্ধু, আত্নীয় তাদের হাতেই। তারা আমাকে দুটো কথা বলার আগে একবারও বুঝলো না এই নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে গিয়ে নিজের যত্ন নিতে পারছি না। আমার শাশুড়ী কে ধমক দিয়ে বলা সম্ভব না যে আমি এই পরিমাণ খাবার খাই না৷ আপনি এবার অফ যান! আমি একাই আমার সাথে যুদ্ধ করি, বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একাই দরজা দিয়ে কাঁদি। আমি গত দেড় মাস যাবত শাড়ি পরতে পরিনা। কোনো ব্লাউজ আমার গায়ে আঁটে না। এই কষ্টই আমার রাখার যায়গা নাই সেখানে যখন কেও আমাকে হাতি ডাকে একটু কি চিন্তা করে দেখেছেন তখন আমার কেমন লাগে?

এখন চিন্তা করুন এই ক’মাসেই যদি এই কষ্ট আমি সহ্য করতে না পারি তাহলে হরমোনের প্রভাবে ছোট থেকেই যে মেয়েটা বডি শেইমিং এর শিকার হচ্ছে তার জীবন টা কেমন? এতো লেখা পড়া করেছেন, শিক্ষত হয়েছেন এবার আচরণে তার বহিঃপ্রকাশ টা ঘটান দেখি!


আর হ্যাঁ আমাকে ভালোবাসুন আমি যখন যেমন ঠিক সেভাবেই। আমার সৌন্দর্য, ফিগার এগুলো তো সাময়িক ধীরে ধীরে নষ্ট হবেই। কিন্তু ব্যক্তিত্ব যা দিনে দিনে আরও বৃদ্ধি পাবে।