সত্যি করে বলুন তো এই ছবির মানুষটাকে দেখে কি মনে হয় তার মুখের চামড়া ঝুলে গেছে, গাল ভেঙ্গে গেছে, শরীরে কোনো শক্তি নেই, মানুষটা একেবারেই বুড়িয়ে গেছে? আগে ভালো করে দেখুন, তারপর বলুন।


আগের দিন রাত আড়াইটা পর্যন্ত অতিথি আপ্যায়ন করার পর সকালে আবার অতিথিদের নাশতা খাইয়ে, সমস্ত বাসা গুছিয়ে পরিষ্কার করে, এমনকি মেঝে পর্যন্ত নিজ হাতে ধুয়ে মুছে অবশেষে আমি যখন চার ফুট উচ্চতার একটা ম‌ইয়ের উপর দাঁড়িয়ে লাউয়ের লতাকে মাচার উপর সঠিক রাস্তা দেখিয়ে দিতে ব্যস্ত, ঠিক তখন কয়েক ফুট দূরে বসে সিগারেটে সুখটান দিতে দিতে অতিথিদের একজন আয়েশ করে এই কথাগুলোই বললেন। তার অপেক্ষাকৃত সংবেদনশীল স্ত্রী মিষ্টি গলায় প্রতিবাদ করলেন, ‘না না, ওর তো অনেক এনার্জি। দেখছো না আমরা আসার পর থেকেই ননস্টপ কাজ করে যাচ্ছে?’


যারা আমাকে উপদেশ দিতে চাইবেন, ‘এসব কথা কানে নেবেন না,’ তাদেরকে বলছি – উপদেশ দেয়ার প্রয়োজন নেই কারণ আমি উনার কথাকে একবিন্দুও পাত্তা দিইনি। আমি জানি এধরনের ভিত্তিহীন কথার একটাই কারণ থাকতে পারে, এবং সেটা হচ্ছে- ‘আঙ্গুর ফল টক!’ পঞ্চাশ বছর বয়সে আমি যে মাত্রার ফিটনেস অর্জন করতে পেরেছি তার জন্য যে মাত্রার ডিসিপ্লিন দরকার সেটা সবার দ্বারা সম্ভব নয়, কাজেই ‘একটু’ খারাপ তো লাগতেই পারে!


তাহলে এই পোষ্ট কেন লিখছি? কারণ আমি জানি যারা এটা পড়বেন তাদের মধ্যেও অনেকে অন্যের শারীরিক গঠন এবং অবস্থা নিয়ে এরকম অসংবেদনশীল মন্তব্য করে থাকেন। নিজের শরীর নিয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে আমি যতটুকু সচেতন এবং কনফিডেন্ট ততটুকু যারা নয়, এধরনের মন্তব্য তাদের আত্মবিশ্বাসকে পুরোপুরি ভেঙ্গে দিতে পারে। কাজেই এধরনের মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন। সক্রিয় ভাবে কাউকে সাহায্য করা সম্ভব হলে করুন, খামাখা জিহ্বা নাড়িয়ে অন্যের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে কি আপনার কোনো লাভ হবে?


বডি শেইমিং আমাদের এতোটাই মজ্জাগত যে এটাকে আমরা প্রায় ‘কেয়ারিং’ এর পর্যায়ে ফেলে দিয়েছি। অন্যের শরীর নিয়ে মন্তব্য করাকে আমরা খুব একটা খারাপ চোখে দেখি না, বরং এর প্রতিবাদ করাটাকেই আমাদের কাছে বাড়াবাড়ি মনে হয়।
‘আহ হা, এতো রিঅ্যাক্ট করছো কেন? উনি নিশ্চয়ই ভালো উদ্দেশ্য নিয়েই কথাটা বলেছেন।’


এজন্যই ইংরেজিতে বলে ‘The way to hell is paved with good intentions.’
আমাদের মধ্যে এমন একটা মানুষ‌ও কি আছে‌ যাকে আমরা ঠিকঠাক ভাবি? হয় বেশি লম্বা, নয় বেশি খাটো। হয় বেশি কালো, নয় বেশি ফর্সা। হয় বেশি মোটা, নয় বেশি শুকনা। মোটা নিয়ে কথা বলাকে আজকাল কিছুটা হলেও খারাপ বলে ভাবা হয়, কিন্তু শুকনা মানুষরা সবার এতো আদরের, তাদের জন্য সবাই এতো ‘কেয়ার’ করে যে তাদেরকে নিয়ে যে কোনো মন্তব্য করতে কারো মুখে এতোটুকুও বাধে না।


অসম্ভব রকমের ইনসেনসেটিভ কথাগুলো বলার সময় তথাকথিত বন্ধুটি একবার‌ও ভাবেননি- এই নারীর বয়স পঞ্চাশ, সে একটা কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছে,
সে একজন ব্রেইন হেমারেজ সারভাইভার, তারপরও লেখিলেখির পাশাপাশি সে দু’ দুটো চাকরি করে, নিজের প্রপার্টি ব্যবসা চালায়, নাট্য চর্চা করে, সমাজ সেবা করে, তদুপরি সুচারুভাবে সংসার ধর্ম‌ও পালন করছে। যার চোখে এরকম একজন নারীকে বৃদ্ধ এবং দুর্বল মনে হয়, তিনি নিজেই আসলে হাসির পাত্র। কিন্তু মা কসম, আমি তাকে নিয়ে একটুও হাসিনি। মায়া লেগেছে।


আসলে এইসব মন্তব্যকারীদের মুখে সেলোটেপ মেরে দিতে পারলে ভালো হতো কিন্তু যেহেতু সেটা সম্ভব নয়, তাদেরকে পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়াই উত্তম। আমি সেটাই করি।‌‌ কাল দুপুরে যখন টমেটোর সালাদের সাথে এক প্লেট বিরিয়ানি নিয়ে আরাম করে খেতে বসলাম, অবাক হয়ে ছেলে বললো, ‘মা আশা করি উনার কথায় ইনফ্লুয়েন্সড হয়ে তুমি গালে মাংস ভরার জন্য এসব খাচ্ছ না?’ অবশ্যই না। মনের সুখে খাচ্ছিলাম, কারণ কাল ছিল আমার cheat day, সাধ মিটিয়ে যা খুশি তা খাবার দিন।‌


আজ সকালে মেয়েকে শুধু ট্রাউজার পরা একটা ছবি পাঠিয়ে পরামর্শ চাইলাম- সাইজ ১২ বেশি ঢিলা, সাইজ ১০ একটু টাইট। I have to either lose or gain a little to be comfortable in my trousers. What do you suggest?'”
ছবি দেখে মেয়ে এতোটাই ফিদা হয়ে গেলো যে পরামর্শ দিতেই ভুলে গেলো- Wow Ma, you have such a strong core! I’m so proud of you! I can’t express in words how happy I am that you have managed to get so healthy and fit!’ (সঙ্গত কারণে সেই ছবিটা এখানে দেয়া হলো না, লজ্জা পেয়ে সবাই আবার কী না কী বলবে।)

একটা ওপেন সিক্রেট বলি- অনেক ব্রেইন হেমারেজ সারভাইভারদের মতো আমিও ডিপ্রেশনে ভুগি। দিনের পর দিন কারো সাথে কথা বলতে ভালো লাগে না, ফোন এলে ধরতে ইচ্ছা হয় না, জীবনে এতো থাকা সত্ত্বেও মনে হয় কোথাও কেউ নেই কিছু নেই। মনে হয় হতাশার অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছি। সেটা তাড়িয়ে রাখার জন্য‌ই নিজের দেহমনের যত্ন নেয়ার চেষ্টা করি।, নিজের আশেপাশের মানুষের, পরিবেশের যত্ন নেয়ার চেষ্টা করি। এই অর্জনের বোধ আমাকে ভালো থাকতে সাহায্য করে। কিন্তু সবাই সমান নয়, ডিপ্রেশনের বিরুদ্ধে লড়াইটাও সবার জন্য সহজ নয়। অনেকের ক্ষেত্রে নেতিবাচক মন্তব্য ট্রিগার হিসেবে কাজ করতে পারে। তারা চিরতরে হতাশার অতলে তলিয়ে যেতে পারে।

সবশেষে বলব কে কীসের মধ্য‌ দিয়ে যাচ্ছে, কী লড়াই লড়ছে আপনি তা জানেন না। কাজেই দয়া করে নিজের জিহ্বাটা সামলে রাখুন, নিজের চরকায় তেল দিন, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শরীর নিয়ে নিজেই মন্তব্য করুন। অন্যেরটা অন্যকে ভাবতে দিন।

ওম শান্তি! ওম শান্তি!