আমরা যারা কোন এক সময় ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলাম বা আছি তারা দল বিশেষে অনেক ধরনের শ্লোগানের সাথে পরিচিত। মানে ধরেন ক্লাস করছেন পাশ দিয়ে মিছিল যাচ্ছে আপনি শ্লোগান শুনে বলে দিতে পারবেন কোন মতের শ্লোগান এইটা। “তুমি কে আমি কে বাঙালী বাঙালী” কিংবা “জয় বাঙলা” আপনি বুঝে যাচ্ছেন এইটা লীগের মিছিল। একজন বলবে খালেদা সবাই বলবে জিয়া – বিএনপির মিছিল। “দুনিয়ার মজদুর এক হও” কিংবা “বিপ্লবরে লাল পতাকা আমরাই উড়াবো” – বামপন্থীদের মিছিল। ওই রকমই “আমরা সবাই তালেবান বাংলা হবে আফগান” অথবা “নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবার” – ইসলামপন্থী কোনো রাজনৈতিক সংগঠন। যদিও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুবাদে আমরা সর্বতভাবে ধর্মীয় রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস পেয়েছিলাম। ফলে এই শ্লোগানগুলো ক্যাম্পাসে শোনা হয় নাই।

এই একই শ্লোগানগুলো মাঠ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাঠে চলে এসেছে। রাজনৈতিক শ্লোগান আসলে কি? শ্লোগান একটি রাজনৈতিক মত বা আদর্শকে সিম্বলাইজ করার তরিকা। খুব অল্প ভাষায় সেই রাজনীতির মূল বক্তব্য কি বা কাদের প্রতিনিধিত্ব করতে চায় সেইটা সামনে নিয়ে আসা। শ্লোগান শুধু কতগুলো শব্দ দিয়ে তৈরী একটা বাক্য না, রাজনৈতিক শ্লোগান একটা ভাবধারা বা একটা মতাদর্শকে প্রতিনিধিত্ব করে।

এখন বাংলা হবে আফগান এই শ্লোগানও সুনির্দিষ্ট ভাবে ইসলামপন্থীদের একটি আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করে। বাংলাদেশকে তারা আফগানিস্থানের মতো বানাতে চায়। আফগানিস্থানের মতো মানে কেমন? সে কি ৮০ দশকের আফগানিস্তান না এখনকার আফগানিস্তান? এই আফগানিস্তান মানে বোঝায় বা আমাদের মাথায় যে চিত্রটি ভেসে উঠে সেটি হলো একটি কুপমন্ডুপ সমাজব্যবস্থা। যে সমাজব্যবস্থায় মেয়েদেরকে রাষ্ট্র জোর জবরদস্তি করে আবায়া বা তালেবানি বোরখা পরাতে বাধ্য করা হয়, পড়তে চাইলে- চাকরি করতে চাইলে নারীদের দোররা মারা হয়, পাথর মারা হয়। প্রেম করলে বা পরকীয়া করলে যে সমাজ ব্যবস্থায় মেয়েদের সরাসরি শিরচ্ছেদ এর নির্দেশ আছে। যে সমাজ ব্যবাস্থায় এবরশন এর আইন নেই, ধর্ষণের শিকার হলে উল্টা ভিকটিমকেই শাস্তি পেতে হয় এই রকম একটি অমানবিক, এবং মেয়েদের জন্য নিষ্ঠুর সমাজব্যবস্থাকে বাংলাদেশের নারীরা আসলে কোনো মূল্যেই চায় না বা চাইবে না। এই রকম একটি সমাজ ব্যাবস্থা চাওয়া বা না চাওয়ার জন্য আসলে বাংলাদেশের মেয়েদের নারীবাদী হওয়ার দরকার নাই, যে কোন সাধারন মেয়েই আসলে কোন মূল্যেই এই ধরনের একটি সমাজব্যবস্থা চায় না।

চাওয়া না চাওয়া এক বিষয় আর বাস্তবতা আরেক বিষয়। এখন আমি সরাসরি কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করতে চাই: বাংলাদেশ রাষ্ট্রে কি আদৌ আফগানিস্তান হওয়ার মতো বাস্তবতা আছে ? আমি শুধু একটা জিনিস দেখি বাংলাদেশে কর্ম ক্ষেত্রে শতকরা কতজন নারী কর্মরত আছে? বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে নীচের গ্রাফের লাল কার্ভটা যদি অনুসরন করেন তাহলে দেখবেন ১৯৯৫ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত কর্ম ক্ষেত্রে নারীর অংশ গ্রহন ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে কিন্তু ২০১৩ থেকে- ২০১৬ আওয়মীলীগ সরকারের আমলে শুধু কমেছে। ১৯৯৫ থেকে ২০০৫/২০০৬ পযর্ন্ত এই অংশগ্রহন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ১৯৯৫ সালে যেখানে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহন ছিলো ১৫.৮% সেটা দশ বছরে বেড়ে হয়েছিলো ২৯.২%। ২০১০ সালের পর থেকে ২০১৩ পযর্ন্ত কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশ গ্রহন কমেছে এবং এবং গত দশ বছরে সেটা বাড়েনি একই আছে। কিন্তু ২০১০ সালের পর থেকে হিসাব অনুযায়ী তো ক্ষমতায় তালেবান বা জঙ্গী বা ইসলাম মনোভাবপন্ন সরকার নয়, বরং ‘প্রগতিশীল’ আওয়ামীলীগ সরকার, তাহলে নারীর কর্মক্ষেত্রে অংশ গ্রহন বাড়েনি কেন?

বাড়েনি এটা যেমন সত্যি তেমনি এটাও সত্যি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। কমেনি কারন পুঁজি। পুঁজি তার প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রমিককে খুজে নেবেই। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক হচ্ছে নারী, কাজেই পুঁজি তার মুনাফার প্রয়োজনেই কম মজুরীর শ্রমিক খুজে নেবে এবং নিচ্ছেও। সর্বশেষ ২০১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের ১৮.১ মিলিয়ন নারী কর্ম ক্ষেত্রে যুক্ত ছিলো। এখন বাংলাদেশকে আফগানিস্তান হতে হলে এই ১৮.১ মিলিয়ন নারীকে কাজ ফেলে দিয়ে ঘরে ঢুকতে হবে। নিজেরাই ভাবেন এইটা কি আদৌ বাস্তব কিনা? এরা জীবন জীবিকা বাদ দিয়ে আর পুঁজি বাজারও তার মুনাফার কথা বাদ দিয়ে, এই স্বল্প মজুরীর ১৮.১ মিলিয়ন শ্রমিককে ঘরে ঢুকিয়ে ফেলবে? পুঁজিবাজার কি ধর্ম নীতিতে চলে? না পুজির মালিকেরা ধর্মপতিদের কথা শুনে নিজেদের লোকসান গুনবে?

এইবার আরেকটি ইন্টারেস্টিং তথ্য শেয়ার করি। সাধারনভাবে আমরা ধরেই নেই যে শহরের নারীরা যেহেতু তুলনামুলক সুযোগ সুবিধা গ্রামীন নারীদের চেয়ে বেশি পায় কাজেই তারা গ্রামীন নারীদের চেয়ে আগানো হবে। এবং সামাজিক বাস্তবতার কারনেই শহুরে নারীর চেয়ে গ্রামীন নারীর উপর ধর্মের বিধিনিষেধ বেশি আরোপ হওযার কথা, অন্তত আমরা তা ধরে নেই। নীচের টেবিলটায় দেখা যাচ্ছে শহুরে নারীদের তুলনায় গ্রামীন নারীরা বেশি কর্ম ক্ষেত্রের সাথে যুক্ত আছেন। এবং ২০১০ থেকে ২০১৭ পযর্ন্ত শহুরে নারীদের কর্ম ক্ষেত্রে অংশ গ্রহন কমেছে যার প্রধান কারন হিসেবে শহুরে উচ্চশিক্ষিত নারীরা মনে করছে বাজারে তাদের উপযুক্ত চাকরি নেই অথবা থাকলেও বেতন সন্তোষজনক নয়। সামাজিক বা ধর্মীয় বিধিনিষেধ এর কারনে শহুরে নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশ গ্রহন কমে গেছে বিষয়টা কিন্তু সে রকম নয়। আবার গ্রামীন নারীদের কিন্তু কাজে অংশ গ্রহন বেড়েছে। তাহলে ‘প্রগতিশীল’ আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় না থাকলে দেশ অচিরেই মৌলবাদীরা দখল করে নিবে এবং দেশকে আফগানিস্তান বানিয়ে ছাড়বে- বারংবার পুনরুৎপাদিত এই ভয়ের ভিত্তি কী?

নারীর কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের বিষয়টা কেন সামনে নিয়ে আসলাম? কারন যে কোনো সমাজ এগিয়েছে না পিছিয়েছে তা বোঝার অন্যতম প্রধান নির্দেশক হচ্ছে নারীর শিক্ষা এবং নারীর কর্মেক্ষেত্রে অংশগ্রহণ। এই নির্দেশকই দেখাচ্ছে যে, বাংলাদেশের মেয়েরা ধারাবাহিকভাবে আগাচ্ছে। এই অগ্রগতি এমনকি বিএনপি জামাত সরকার আমলেও একইভাবে অব্যাহত ছিলো বরঞ্চ সেই আমলে রেখা উর্ধমূখী ছিলো। এবং প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রে মেয়েদের শিক্ষার হার ছেলেদের চেয়ে বেশি। নারীদের বিষয়টাই সামনে আনতে হলো, কারন তালেবানী-রাষ্ট্র কায়েম হতে যাচ্ছে এটা বলে যারা ভয় দেখান তারা মূলত নারীর ওপর আসন্ন যে বিপদ সেটাকেই সামনে আনেন। হ্যাঁ, ‘তালেবানী রাষ্ট্রে’র বিপদকে খারিজ করছি না, বরঞ্চ প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশের বিদ্যমান বাস্তবতায় এই ‘তালেবানী ভয়’কে কেনো উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন করা হচ্ছে? ‘বাংলা হবে আফগান’ বলে যে জুজুর ভয়ের ইশারা করা হয় সেটা কেন? এবং আওয়ামীলীগের ক্ষমতায় থাকা বা না-থাকার সাথে ‘বাংলা হবে আফগান’ সংক্রান্ত ভয় কীভাবে মিশে গেলো?

এইবার আরেকটা ইন্টারেসটিং গ্রাফ দেখা যেতে পারে। এটা বিআইডিএস এর গবেষণায় প্রকাশিত গ্রাফ; ২০১৮ সালে ডেইলী স্টারেও প্রকাশ পেয়েছে। এইখানে ২০১৩ সাল এবং ২০১৬ সালে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশ গ্রহণ তুলনা করা হয়েছে। এই গ্রাফে দেখা যাচ্ছে ২০১৩ থেকে ২০১৬ এই চার বছরে শিল্প, সেবা, কারখানা প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে নারীর অংশ গ্রহন কমেছে, শুধুমাত্র কৃষিতে নারীর অংশ গ্রহন বেড়েছে। এবং সব সেক্টর মিলে নারীর কর্মক্ষেত্রে অংশ গ্রহণ ৩২.৮% থেকে কমে ২৮.৫% হয়েছিলো। বলাই বাহুল্য এই চার বছরে ক্ষমতায় ছিলো ‘প্রগতিশীল’ আওয়ামিলীগ সরকার। তাহলে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশ গ্রহন কমলো কেন?

Figure published in March 08, 2018 Daily star

এবার আরো কিছু তথ্য দেখা যেতে পারে। নিচের টেবিলে গত দশ বছরে নারীর প্রতি সহিংসতা দেখানো হয়েছে; ঢাকা ট্রিবিউন নভেম্বর ২০১৯ এ প্রকাশিত। গত দশ বছরে নারীর প্রতি সহিংসতা শুধু যে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে তা-ই নয় বরঞ্চ সেটা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। এই সংখ্যা বাংলাদেশের যে কোনো সরকারের শাসন আমলের চেয়ে বহুগুন বেশি। তাহলে ‘বাংলা কোনো একদিন আফগান হবে যখন কিনা নারী বেহাল দশায় পড়বে’ – এটা নিয়ে আসলে কেন ভয় পাচ্ছি? কোনো পরিস্থিতির কারণে? এই ১০ মাসে ১১৯২ ধর্ষণের ঘটনা কি যথেষ্ট না? আফগান এর সমাজ বলতে তাহলে আসলে আমরা আর কি বুঝি? একটা ধর্ষণ মামলার বিচার যখন হয় না, (উল্লেখ্য, এখানে ধর্ষণের শতকরা মাত্র তিন ভাগ মামলার অপরাধীরা শাস্তি পায়) মাত্র দশ মাসে ২০৪ টা সঙ্ঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, তখন আসলে পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ না খুঁজে ‘বাংলা হবে আফগান’ শ্লোগানের ভয়ে কাতর? এই ‘আফগান হয়ে যাওয়া’ বা ‘শত্রুপক্ষে’র আগমণের ফলে যে প্রতিবেশ ও পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার ভয় দেখানো হয়েছিল, বর্তমান খোদ ‘প্রগতিশীল’ সরকারই তো কাছাকাছি প্রতিবেশ ও পরিস্থিতি তৈরি করে রেখেছে। এটা কেবল নারী নিয়ে বললাম, মত প্রকাশের স্বাধীনতাসহ অন্যান্য ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন জুড়ে দিলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরো টের পাওয়া যাবে।

ধর্ম নিয়ে রাজনীতি:
ধর্ম নিয়ে রাজনীতি শুধু যে ধর্মীয় সংগঠনগুলো করে সেইটাই না কিন্তু, এমন কি প্রগতিশীল রাজনৈতিক মতবাদের দাবী করনেওয়ালা সংগঠনগুলোও ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করতে পারে, এবং করেও। ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠনগুলো তারা কি সমাজ চায়, কিভাবে চায় সেই মোতাবেকই তাদের রাজনৈতিক বয়ান হাজির করে। কিন্তু অনেক প্রগতিশীল সংগঠন তাদের অন্যতম রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হিসেবে হাজির করে ধর্মীয় সংগঠনগুলো কি চাইলো তার কাউন্টার-বক্তব্য। নিজস্ব স্বাধীন চিন্তা-পদ্ধতি অনুসরন করে তাদের রাজনৈতিক ন্যারেটিভ তৈরী হয় না। তাদের অন্যতম রাজনৈতিক ন্যারেটিভ হচ্ছে ধর্মপন্থী রাজনীতিকে কাউন্টার দেয়া। জাতীয়তাবাদী দলগুলো এইখান থেকে বরঞ্চ অনেকখানি মুক্ত। দার্শনিক অবস্থান থেকে এবং আদর্শিক অবস্থান থেকে তারা নিজস্ব রাজনৈতিক বয়ান হাজির করে। তাদের যখন প্রয়োজন হয় তারা ধর্মপন্থীদের ব্যবহার করে, যখন প্রয়োজন নেই তখন তারা এইগুলো নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামায় না। অর্থাৎ ধর্মপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে তাদের সম্পর্ক কৌশলগত, এইখানে তারা ধর্মকে ব্যবহার করার জন্য বা কাউন্টার দেয়ার জন্য নিজেদের রাজনৈতিক ন্যারেটিভে কোন মৌলিক পরিবর্তন আনে না। অপর দিকে সেকুলার মনোভাবাপন্ন রাজনৈতিক মন অন্যতম মৌলিক রাজনৈতিক ন্যারেটিভ হিসেবে হাজির করে ধর্ম নিয়ে রাজনীতির বিরোধী বক্তব্য। আমি আরেকটু সরল করার চেষ্টা করি বিষয়টা। বিষয়টা ধর্মপন্থীরা বলছে ধর্ম ভালো আর সেকুলারপন্থীরা বলছে ধর্ম ভালো না। [অবশ্যই এখানে সব সেকুলার বা সেকুলারপন্থীকে বলা হচ্ছে না, বরঞ্চ মোটাদাগে একটা প্রবণতার বিষয়ে আলাপ করা হচ্ছে।] খেয়াল করেন দুটো চিন্তা পদ্ধতিরই মূলে রয়েছে ধর্ম। একদল ধর্ম ইতিবাচক ধরে নিয়ে রাজনৈতিক বয়ান হাজির করছে, আরেকদল ধর্ম নেতিবাচক ধরে নিয়ে রাজনৈতিক বয়ান হাজির করছে। ধর্ম ভালো- চিন্তার অবস্থান ভাব জগত, ধর্ম খারাপ- এই চিন্তার অবস্থানও ভাব জগত; এই চিন্তার সাথে আসলে বাস্তব জগতের সম্পর্ক কোথায়? বাংলাদেশে ধর্ম খারাপ না ভালো এই প্রশ্নের সাথে আসলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, ওষুধ নীতিমালা, অর্থনৈতিক কাঠামো, জিডিপি বা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, বেকারের হার, বিচার বহির্ভূত হত্যা, বাজারের খাদ্যদ্রব্য মূল্যবৃদ্ধি- এই সমস্ত ইহজাগতিক সমস্যার কোনটার সাথে আসলে উপরের ঐ দুই চিন্তার সম্পর্ক আছে? যদি না থাকে তাহলে যারা সেকুলার রাজনীতি করেন বলে মনে করেন তারা আসলে তাদের রাজনৈতিক বয়ান ধর্ম বিরোধী অবস্থান থেকে হাজির করছেন কেন? এবং এই পলিটিক্যাল ন্যারেটিভে আসলে কে লাভবান হচ্ছে?

মৌলিক প্রশ্ন যেটাতে এসে দাড়িয়েছে সেটা হচ্ছে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর কতটুকু নাগরিক অধিকার আছে? এই প্রশ্নে এসে সেকুলারপন্থীরা যেভাবে চিন্তা করেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেন তাতে দেখা যায় যে একটা বড়ো অংশই সম নাগরিক-অধিকারে বিশ্বাসী না। সব চেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে ইসলামিস্টদের নাগরিক অধিকার কতটুকু পাওযা উচিত কতটুকু নয় এই সিদ্ধান্ত সেকুলাররা দিয়ে দেন। একইভাবে কট্টর ইসলামিস্টরাও সিদ্ধান্ত দিয়ে দেন অমুসলিম অথবা নাস্তিকেরা কতটুকু সামাজিক অথবা নাগরিক অধিকার পাবে। আমাদের প্রগতিশীল মন মনেই করে নাগরিক হিসেবে ইসলামিস্টরা কতটুকু নাগরিক অধিকার পাবে, বা পাবে না সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয়ার এখতিয়ার তাদের আছে। এবং সেই মোতাবেকই তারা তাদের বয়ান তৈরি করেন এবং হাজির করেন। বিরাট একটা অংশের প্রগতিশীল মন মনেই করেন ইসলামিস্টদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করা ঠিক আছে, যদি সে ইসলামিস্ট হয় তাহলে কোন ধরনের এরেস্ট ওয়ারেন্ট ছাড়া একজনকে সাদা পোশাকে তুলে নিয়ে যাওয়া ঠিক আছে, এমনকি প্রতিবাদ করার কারনে তাদের পাখির মতো গুলি করে মারাও ঠিক আছে, যদি তারা ইসলামিস্ট হয়। একইভাবে কট্টর ইসলামিস্টরাও মনে করে ধর্মানুভূতিতে আঘাত হানলে তাকে এরেস্ট করা ঠিক আছে, তার আদর্শের সমালোচনা করলে তাকে কাতল করাও ঠিক আছে। মদ্দা কথা এইখানে দুই দলই দুই দলকে ‘কম-নাগরিক’ হিসেবে হাজির করছে। মানে নাগরিক হিসেবে আমি নিজের জন্য যে যে অধিকার চাই আমার শত্রুর জন্য ঠিক সেই সেই অধিকার চাই না, বরঞ্চ তার অধিকারকে খর্ব করতে চাই।
এইখানে মৌলিক প্রশ্ন হচ্ছে নাগরিক অধিকার। আধুনিক রাষ্ট্র প্রত্যেকটি নাগরিকের দল মত, ধর্ম পরিচয়, জেন্ডার পরিচয়, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে কিছু অধিকার গচ্ছিত রাখার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই প্রতিশ্রুতি পালনের জন্যই সমাজবদ্ধ মানুষ রাষ্ট্রের তৈরি করেছিলো। সেই প্রতিশ্রুতির মধ্যে ভাত কাপড়ের নিশ্চয়তা, শিক্ষার নিশ্চয়তা, জানমালের নিশ্চয়তা অন্তর্ভূক্ত। একজন চিন্তাশীল নাগরিক হিসেবে আপনার দেখার কথা রাষ্ট্র তার এই প্রতিশ্রুতিগুলো রক্ষা করছে কিনা। যদি রক্ষা না করে তাহলে রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করছে তাদের কাছে জবাবদিহী চাওয়ার কথা: কেন সে তার কথা রাখছে না? এবং একটা দেশের নাগরিক হিসেবে আপনি যদি চান যে সব সময়ই রাষ্ট্র বা সরকার বাধ্য থাকবে আপনার এই অধিকারগুলো রক্ষা করতে, তাহলে এইটাকে আপনার সিস্টেম হিসেবে দাড় করাতে হবে এবং সিস্টেম হিসেবে কাজ করাতে হবে। সর্বজনের অধিকার রক্ষার বয়ান আপনাকে এমনভাবে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে প্রথিত করতে হবে যেন যে কোন সরকার ক্ষমতায় আসলেও তাতে কিছু যায় আসে না, সকল সরকার যে কোনো পরিস্থিতিতে নাগরিকের এই সকল মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে বাধ্য থাকে। এখন এটা যদি আমরা করতে চাই তাহলে ‘ইসলামিস্টরা কম-নাগরিক অথবা নাস্তিকেরা কম-নাগরকি, তাদের নাগরিক অধিকার খর্ব হলে ঠিক আছে, আমি বেশি নাগরিক আমার জন্য বেশি অধিকার প্রযোজ্য’- এই মনোভাবে নিয়ে কখনো সর্বজনের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব কিনা? বিশেষ করে যারা সাম্যের কথা বলেন, সাম্যের পক্ষের রাজনীতি করেন বলে দাবী করেন তারা কি আসলে এভাবে বলতে পারেন কিনা যে, আমার জন্য ঠিকঠাক নাগরিক অধিকার আর আমার শত্রুর জন্য সীমিত পরিসরে নাগরিক অধিকার?

তাহলে কী বিষয়টা এমন যে বাংলা হবে আফগান এইটা পুরাটাই প্রপঞ্চ? আমাদের দেশে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি হয় নাই? বা হলে সেটা কি সুস্থ ধারার বা নাগরিক অধিকার আদায়ের মতো রাজনীতি হয়েছে? ধর্মীয় রাজনীতির সহিংসতা কী হয় নাই? এই প্রশ্নের একটা ধারাবাহিক প্রেক্ষাপট আছে। এর উত্তরে উদিচীর শিল্প গোষ্ঠীর উপর বোমা হামলা, ১লা বৈশাখে বোমা হামলা, ব্লগার হত্যা, হলি আর্টিজানের জঙ্গি হামলা, ধর্মীয় সংখ্যালঘুর ওপর হামলা এই ঘটনাগুলোকে আমলে নিতে হবে। আমলে নিয়ে বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করতে হবে। এইখানে একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: রাজনৈতিক ইসলাম এবং জনসাধারনের মাঝে যে ইসলামী চেতনা এবং র্চচা তার মাঝে মৌলিক র্পাথক্য আছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাদ্দাম নামে এক তরুন একবার লিখেছিলেন বাংলাদেশের মুসলমান তিন ধরনের -হেফাজতী মুসলামন, জামাতী মুসলমান আর জুম্মা মুসলমান। আমি তার চিন্তা ধার করেই আমার কথা জুড়ে দিচ্ছি। বাংলাদেশে এই জুম্মা মুসলমানের সংখ্যাই বেশি। এই জুম্মা মুসলমানরা নিজেদেরে মুসলমান মনে করে কিন্তু খুব বেশি ধর্ম কর্ম নিয়ে ব্যাতিব্যস্ত থাকবে না, শুক্রবার দিন নামাজ পরবে, ঈদ করবে, রোজা রাখবে এবং সংসার বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে র্নিঝঞ্জাটে থাকতে চায়। কিন্তু, ইসলাম তার কাছে একটা পরিচয়ও বটে, তবে একাট্টা নয়; আরো বহু পরিচয়ের সাথে এটিও একটি। পরিচয়বাদী রাজনীতিকে সমর্থন বা উষ্কে দেয়ার জন্য এটা বলা হচ্ছে না। কখন কোন অবস্থায় বা পরিস্থিতিতে একটা নির্দিষ্ট পরিচয়কে কেন্দ্র পরিচয়বাদী রাজনীতি শুরু হতে পারে সে বিষয়ে যথেষ্ট সতর্ক থাকা দরকার, ব্যবস্থাকে এমনভাবেই গড়ে তোলা দরকার যেন তা পরিচয়বাদী রাজনীতিকে উষ্কে না দেয়। এখানেই আসে ‘নাগরিক’ পরিচয়টাকে সামনে নিয়ে আসার। রাষ্ট্রের সামনে আমার প্রধান পরিচয় ‘নাগরিক’। বাঙালি মুসলমানকে যারা মজলুম হিসাবে উপস্থাপন করতে চান, তারাও পরিচয়বাদী রাজনীতির ফাঁদে পা দিতে পারেন বা দিতে চান। বাঙালি মুসলমান রাষ্ট্র গঠনের প্রায় পঞ্চাশ বছর হয়ে গিয়েছে। ফলে সে আর ‘মুসলমান’ পরিচয়ের কারণে নির্যাতিত নয়, বরঞ্চ ‘নাগরিক’ হিসাবেই সে নির্যাতিত। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে হেফাজত মুসলমান এবং জামাতী মুসলমানের সংখ্যা এবং প্রভাব যে খুব একটা তাৎপর্যপূর্ণ ছিল না তার প্রমাণ নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের ভোটে পাওয়া যায়। যদিও ‘প্রগতিশীল’ আওয়ামীলীগ ও ‘প্রতক্রিয়াশীল’ বিএনপি সবাই নব্বই পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময়ে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল, এবং ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছিল। এবং সেটা সেকুলার রাজনীতির নাম করেই করা হয়েছিল। বর্তমানে ইসলামীকরণের দায় গবেষকগণ ‘সেকুলার’ আওয়ামী সরকারের কান্ধেই বর্তাচ্ছেন। এবং, গণতন্ত্রহীন পরিবেশে যেখানে কিনা বিভিন্ন গণতান্ত্রিক শক্তিকে রাষ্ট্রীয় কলকব্জা দিয়ে দমন করা হয়ে থাকে সেখানে এমন শক্তির উত্থানও ঘটতে পারে যারা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাস স্থাপন করে না। বর্তমানে অবশ্য গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে সবচেয়ে বেশি অবিশ্বাস করে আদতে আওয়ামীলীগ সরকার ও এর তল্পিবাহকরা। কিন্তু, এই ‘জুম্মা’ মুসলমান, মানে আমজনতার চর্চা আসলে র্নিধারণ করে বাংলাদেশের সামাজিক ইসলাম এর ধরন এবং চর্চা কী রকম হবে।

এখানে কিন্তু বলা হচ্ছে না যে, যারা বাংলাকে আফগান বানাতে চান বা এমন আকাঙ্ক্ষা থেকে শ্লোগান দেন তাদের রাজনীতির সমালোচনা করবো না। এর সমালোচনা বা প্রয়োজনে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়াও যাবে। কিন্তু বাংলাদেশের বিদ্যমান অবস্থাতে এর চেয়েও জরুরি প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে বাস্তবিক ভিত্তিহীন ‘বাংলা হবে আফগান’ নামক শ্লোগান ব্যবহার করে এমন একটা রেজিম জারি আছে যারা কিনা এই ভয় উৎপাদন করে এই ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠীকে অ-নাগরিকে পরিণত করেছে। নাগরিকদের মধ্যে তৈরি করেছে পারষ্পরিক বিদ্বেষ, ঘৃণা ও ভয়।

এখন এই যে জুম্মা মুসলমান বা সামাজিক মুসলমানের যে সংস্কৃতি, যারা সেকুলার অথবা যে রাজনৈতিক মনন সেকুলার তারা আসলে কীভাবে একে দেখবেন? বা সামাজিক মুসলমানের মনকে সেকুলাররা কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন? অথবা আমাদের এখানে ‘প্রচলিত’ সেকুলার রাজনৈতিক বয়ান থেকে বের হয়ে এসে, বা বের না হয়েই, এই বাঙালি মুসলমানের সাথে তাদের রাজনৈতিক সম্পর্কই বা কি রকম হবে? মোদ্দা কথা এটা জরুরি যে, এখানকার সামাজিক ধর্মীয় মনের সাথে সেকুলার মনের রাজনৈতিক সম্পর্ক কীভাবে তৈরি হবে যেখানে কিনা একে-অপরের প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ থাকবে না, তা নতুন করে ভাবনার প্রয়োজন আছে। এখানেই আসলে ‘নাগরিক’ পরিচয়ের প্রয়োজনীয়তা। ফ্যাসিবাদের মাটিতে কেন এ প্রয়োজন অনুভূত হলো এবং কিভাবে, এই প্রশ্ন দুটোর উত্তর আরেকদিন খুজব!