বাবা নিয়ে আমার কোনো ভালো স্মৃতি নাই। যা আছে তা অতি মাত্রায় দূর্বিষহ! ভয়ংকর, যা আমাকে আজও শান্তিতে ঘুমাতে দেয় না। আমার শৈশব আর কৈশোর মাত্রাহীন শারীরিক এবং মানসিক অত্যাচারে ভরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। উনি আমাকে অথবা আমাদের অত্যাচার করে পাশবিক আনন্দ পেতেন। বাইরের যত ব্যর্থতা সব ঘরে এসে মিটাতেন। তার রাগের বলি সবচেয়ে বেশিবার আমিই হতাম। মা প্রথম প্রথম কষ্ট পেলেও একসময় এগুলো তার গা সওয়া হয়ে গেছিলো। অফিস থেকে এসে যখন দেখতেন আমাকে মেরে আধমরা বানায়া ফেলছে তখনও তিনি নির্লিপ্তভাবে ভাতের ডিস নিয়ে খেতে বসতেন। এতে করে আমার ধীরে ধীরে মাকেও ঘৃণা হতে লাগলো। সেই সময় একটা ছেলের সাথে কথা বলতাম নাম শাওন। ওকে বলতাম তুমি আমাকে নিয়ে পালায়া যাও। আব্বু কোনো একদিন আমাকে মারতে মারতে মেরে ফেলবে। ও বলতো চলে আসো। ব্যাগ গুছানোর সময় মনে হতো আজ আব্বু মারছে, তাই শাওনের সাথে পালাইলাম। কাল শাওন মারলে কার সাথে পালাবো? আমি সেখানে অপেক্ষা করতে লাগলাম কবে ইন্টার কমপ্লিট করে ঢাকা চলে যাবো। আব্বুর থেকে অনেক অনেক দূরে।


তিনি আমাদের তিন বোনের কোনো খরচপাতি চালাতেন না। তার ইনকাম ছিলো তার একান্তই ব্যক্তিগত যাতে আমাদের কারো কোনো অধিকার ছিলো না। তবে উনি মাঝে মাঝে আমার বই খাতা কিনে দিতো। তাই যখন রেজাল্ট খারাপ হতো টেনে আমার বই খাতা গুলো ছিড়ে ফেলতে উনি কখনো দুইবার ভাবতেন না। পরবর্তীতে আমি আবার সুই সুতো নিয়ে সেগুলো বসে বসে সেলাই করতাম।

আমাদের বাসায় ৬/৭ টা বেড রুম ছিলো। উনি আরো ৭/৮ ঘর বাড়ালেন তারপর সেখানে মেয়েদের মেস দিয়ে দিলো। আর আমাদের জন্য রাখলেন মোটে দুইটা ঘর। আমরা সেখানেই কষ্ট করে থাকতাম। মেসের ঐ সব মেয়েদের সাথে আমার ঝামেলা লেগেই থাকতো। তারা আব্বুর কাছে নালিশ দিয়ে আমাকে মার খাওয়াতো। আর দূর থেকে দেখে মিটমিট করে হাসতো। কিছু বছর পরে আব্বু সেখান থেকেও আমাদের বের করে দিলো।
ক্লাস এইটে ওঠার পর আব্বু আমাদের এই বাসা থেকে বের করে দেয়৷


একবার আমার সকালে উঠতে বেশ দেরি হলো। আব্বু আমাদের ডাকতে আসলো ঘুম থেকে। সে ডাকে আমরা উঠি না। বলে গেল দশ মিনিট পরে এসে যদি দেখে না উঠছি তাহলে খবর আছে। আব্বু বদমেজাজী, রাগী আর পাগল ছিলো। নইলে কেউ গরু পিটানোর লাঠি দিয়ে নিজের ঘুমন্ত বাচ্চাদের আঘাত করতে পারে না। সে যতক্ষণ না ক্লান্ত হলো আমাদেরকে বেদম পেটালেন। আমার তিন বছরের ছোট্ট বোন দিয়া দূর থেকে সে দৃশ্য দেখে চমকে উঠছিলো বারবার। সে চলে যাওয়ার পরে দুইবোন খাটে বসে কাঁদছিলাম। খাটের পাশে দেখলাম আব্বু ভুল করে ফোনটা ফেলে গেছে যেটুকু রাগ অবশিষ্ট ছিলো তা ঐ ফোনের উপর ঝাড়লাম। আমি আর দিশা ফোনটা টুকরো টুকরো করে ফেললাম। মা অফিস থেকে এসে এই অবস্থা দেখে কাঁদতে শুরু করলো।


যেখানে আমার বাবার আমাদের অত্যাচার করার জন্য কখনোই কোন কারন লাগতো না সেখানে আমি তার মোবাইল টুকরো টুকরো করে ভেঙে ফেলেছি। আম্মু ভয়ে খালুজানের সাথে আমাকে খালার বাড়ি পাঠিয়ে দিলো। এই খালু আবার আমার সম্পর্কে খালাতো মামা হয়। বাবা যখন বুঝলো তার মোবাইল নাই এবং এটা আমিই করেছি তখন সে রাগে আরো উন্মাদ হয়ে গেল। আমাকে খুঁজে না পেয়ে সব রাগ গিয়ে পড়লো আমার মায়ের উপর। যেহেতু আমি বাড়িতে ছিলাম না তাই বলতে পারিনা সেদিন আমার মায়ের সাথে ঠিক কি হয়েছিলো। তবে আব্বু আমাদের সব কাপড় চোপড় বাইরে নিয়ে ফেলে দিসিলো আর কিছু কাপড়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিলো। আমি তো ঈশ্বরদী খালার বাড়িতে চলে গেলাম। কিন্তু অনিশ্চয়তায় পড়ে গেলাম বাড়ি কবে ফিরবো অথবা বাড়ি ফিরলেই বা তারপর কি হবে?


এক মাস ছোট খালার বাড়ি ছিলাম। সেখান থেকে নানু বাড়ি গেলাম। সেখানে পনেরো দিন ছিলাম। এর মধ্যে বাবা আমার মাকে আর ছোট দুই বোনকে অলরেডি বাসা থেকে পুরোপুরি বের করে দিসে। আম্মু এসে আমাকে নানু বাড়ি থেকে নিয়ে ভাড়া বাড়িতে উঠলো। আমাদের তিন বোনের লেখাপড়া অনেক দিন পরে আবার স্বাভাবিক হয়ে আসলো। আমরা এখান থেকেই নিয়মিত স্কুলে যাই, কোচিং এ যাই। তাও আবার আসল বাড়ির উপর দিয়েই। ঐ পাড়ায় লোকজন খারাপ ছিলো বলে আম্মু আমাদের বোরকা পরাই দিলো। তাই আমরা তখন নিয়মিত বোরখা পরতাম।

একদিন দুপুরে স্কুল থেকে ফিরে দেখি আব্বু বসে ভাত খাচ্ছে। পুরো শরীরটাই বিষিয়ে গেল তাকে দেখে। তবুও জিগ্যেস করলাম কেমন আছো? রাতে আম্মু বললো সে মাঝে মাঝে আমাদের এখানে এসে থাকবে নইলে আমাদের নিরাপত্তার সমস্যা হবে। আব্বু এর মধ্যে কিছু আসবাবপত্র এনে দিয়ে গেল। তবুও আমাদের খাট ছিলো না আমরা দিনের পর দিন নিচে ঘুমিয়েছি। ফ্রীজ ছিলো না। এমন কি মাথার উপর ফ্যান ও ছিলো না। অথচ ঐ ফাকা বাড়িতে এগুলো সব ছিলো। সেগুলো ওখানে কার সেবা করার জন্য পড়ে ছিলো আমি জানি না।


এ বাসায় ওঠার চার মাস পড়ে এলাকায় ছ্যাচরা পোলাপানের অত্যাচারে এ বাসা টাও আমাদের ছাড়তে হলো। এ বাসাতে ও একদিন আব্বু আমাকে খুব মারলো। কি নিয়ে তা মনে নাই। তবে দায়ের উল্টো পাশ দিয়ে খুব মেরেছিলো। আমি সেদিন কাঁদিনি চোখ বড় করে তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সে বললো চোখ নামা। আমি নামাইনি ৷ সে দিনও না আজ পর্যন্ত না। আমার বাপের কাছেও না। পৃথিবীর কারও কাছে না। সে আমার মুখে সোজোরে লাথি মারলো। মাথাটা পাশের দেয়ালের সাথে খুব জোরে বাড়ি খেলো। আব্বু আমাকে আধমরা করে রেখে নিজ বাড়িতে চলে গেলো। আমার জ্ঞান ফিরলে ব্যাগ নিয়ে বেড়িয়ে গেলাম। কোন গন্তব্য নাই দুপুরের টাক ফাটা রোদে শুধু হাঁটছি আর হাঁটছি। পিছনে তাকিয়ে দেখি দিশা আসছে। কাছে এসে বললো আপু ঘরে চলো প্লিজ ৷ বললাম আমার যেতে ইচ্ছে করে না। তাও টুকটুক করে ওর হাত ধরে বাড়ির পথে হাঁটা দিলাম।
এই যে বলছি বাড়ির পথে এটাও কিন্তু ভুল! এখানে বাড়ি কিন্তু দুটো একটা যেখান থেকে বাবা আমাদের বের করে দিসে আর অপরটা যেখান থেকে আমি রাগ করে বের হয়ে আসছি। আসলে এই বাড়ি শব্দটাই ভীষন রহস্যময়। যেমন, এক বাপের বাড়ি আর এক শ্বশুরবাড়ি। নারীর আসল বাড়ি কোথায়?

আরেক অর্থে বাড়ি হলো সেটাই যেখানে পরিবারের সকলে একসাথে বসবাস করে। কিন্তু আমার পরিবার? যেখানে পরিবারের ভীত নরম আর ভঙ্গুর। যেখানে আশ্রয় নাই। নিরাপত্তা নাই। সেটা পরিবার হতে পারে না। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি। যে পরিবারে আমি জন্ম নিয়েছি এমন পরিবার যেন কোন শিশু না পায়। এমন অসুখী দম্পতি যেন নিসন্তান হয়ে মরে।


ঢাকা চলে আসার পর পাঁচ ছয় বছর পর্যন্ত তার সাথে আমি কোনো কথা বলিনি, কোনো সম্পর্ক রাখিনি। এমনকি তার মুখের দিকেও কখনো আর তাইনি। তার সাথে আবার কথা বললাম আমার বিয়ের সময়, বিয়ের ব্যপারে। তার দিকে তাকালাম এতো বছর পরে। মাথার কালো চুল গুলোয় সাদা মেঘেরা বাসা বেঁধেছে। মুখের চামড়া অনেকটা কুঁচকে গেছে। অথচ কিছু বছর আগেও তিনি ছিলেন ছয় ফুট হাইটের অসম্ভব সুদর্শন এক পুরুষ। তার দিকে তাকালে আমার মায়া হয় না কিছুই আর ফিল হয়না। উল্টো ভেতর থেকে কেমন এক দীর্ঘশ্বাস একা একাই বেড়িয়ে আসে।


যাই হোক অনেক কিছু বলে ফেলেছি। মনটা কেমন যেন হয়ে গেল, আর কিছু বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না। পৃথিবীর সকল বাবাদের বাবা দিবসের শুভেচ্ছা।