আমেরিকা জীবনে আইসা কিছু জিনিস বড়ই ধাঁধার মত লাগে, যাকে বলে “হোয়াইট পিপলস প্রব্লেম”। তাঁদের প্রব্লেম সম্পর্কে জেনে বুঝে মাঝে মাঝে তাজ্জব হইতে হয়! কিন্তু আমি পাক্কা পেশাদার আন্থ্রোপলোজিষ্ট হিসাবে তাঁদের “জাজ” করতে পারি না! নৃবিজ্ঞানের ভাষায় বলতে পারেন এইগুলা আমার “কালচারাল শক”। আগে আমি ভাবতাম প্রব্লেমের মালিকানা কেবলই বাদামী, কালো, হলুদের জন্যে বরাদ্দ!


তো হোয়াইট পিপলদের আমার খুবই পছন্দ, বিশেষ করে “স্কিল” জিনিসটাকে তাঁরা ধর্মের মত সম্মান করে, তাঁদের মুহূর্তের মধ্যে ইমেইলের উত্তর দেয়া, ফোন ধরা, ফোনের উত্তর দেয়া, প্রশ্ন মন দিয়ে শুনে সিন্সিয়ারলি উত্তর দেয়ার চেষ্টা করা, আর সময় মত কাজ করাতে মুগ্ধ না হওয়া কঠিন। আমার কন্যার স্কুলের বন্ধুরা ফোন করে জিজ্ঞাসা করে, “ইজ ইট ওকে টু টক উইত আলিনা?” কিম্বা বলে “ইজ ইট সেফ টু আস্ক দিজ কোএসচেন?” এই বাচ্চাগুলারে আমার নিজের বাচ্চা জ্ঞান করি! এদের প্রাইভেসি এতো দুর্ভেদ্য যে, কোন আলাপই আগানো কঠিন! আমার কন্যা এতে বড়ই বিব্রত বোধ করে। ফট কইরা একটা কথা বইলা দেয়ার আরাম এদের নাই! পাড়ার বাচ্চারা সাইকেল কইরা বন্ধু বাড়ী চইলা আসবে, নীচের থেকে ডাক পাড়বে, বন্ধুদের নিয়া পার্কে খেলতে চইলা যাবে, এমন জিনিস চিন্তা করতে পারে না! এদের বায়োলজিকাল আর ফসটার প্যারেন্ট কে কোনটা ঠাহর কইরা কুলাতে পারি না!


যা হোক এবার আসি তাঁদের নিত্যদিনের জীবনের অদ্ভুত কিছু সমস্যার বিষয়ে। ঢাকা থেকে যখনই আম্রিকা আসি, তখন প্রায় যেন অন্য গ্রহে চইলা আসছি, এমন অনুভূতি হয়। আমাদের ঢাকার জীবন চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলাপূর্ণ, কোলাহল, ধাক্কাধাক্কি, চিল্লাপাল্লা, হাউ-কাউ, প্রায় কোন কিছুই কাজ করে না, প্রায় কোন কাজই সময় মত হবে না, কোন ক্যালেন্ডার কিম্বা ঘড়ির পরোয়া কেউ করে বলে দুর্নাম করার উপায় নাই। কখন কোথায় রওনা হইয়া কোথায় যাইয়া পোঁছাবো কেউ জানেনা। কখন পৌঁছাবো, তাও জনেনা! কেউ কারো কথা শোনে না, সবাই এক সাথে কথা বলে। ইউরুপ-আম্রিকাতে সব কিছু সুশৃঙ্খল, সময় মত ঘড়ি আর ক্যালেন্ডার ধরে চলে, এক জনের কথা শেষ হইলে আরেক জন তাঁর পয়েন্ট বলে। বড়ই আরাম। এমন কি বাচ্চাদেরও চিল্লা-পাল্লা নাই! এতে সমস্যাটা কি?
এই অবস্থায় হোয়াইট পিপলস প্রব্লেম হল, সারপ্রাইজের বড়ই অভাব। ঢাকার জীবনে মুহূর্তে মুহূর্তে সারপ্রাইজ। পরের মাস, পরের সপ্তায়, পরের দিন দূরের কথা, একটু পরে কি হচ্ছে, তাও ঠাহর করা কঠিন। একমাত্র খোদা ছাড়া কেউ কিছু জানেনা। আম্রিকাতে মানুষের কাজ কর্ম গুগল ক্যালেন্ডারে বছরওয়ারী প্ল্যান করা! এরা জীবনকে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা করে ভিশন বোর্ড বানিয়ে দেয়ালে ঝুলায়ে রাখে। রান্নাঘরে মশলার তাকের মত লেবেল করা বয়ামে সব গুছায়ে রাখা! শিডিউল বলে একটা ধর্ম গ্রন্থ আছে, তা কেউ লঙ্ঘন করতে পারে না! ওয়ার্ক ফ্রম হোমের জমানায় শিডিউল মোতাবেক জুমে দেখা করা হয়! হোম অফিস থেকে দেখার আগে টেক্সট পাঠাইতে হয়! কারো বাসায় কেউ অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া আইসা গেজাইতে পারবেন না! শুক্রবার রাতের পরে ছাড়া কারো সঙ্গে দেখা করতে পারবেন না!


এখন জন্মদিনে মানুষকে সারপ্রাইজ দেয়া আর হওয়ার ভান করা ছাড়া উপায় নাই। সারা আমেরিকাতে ওয়ালমার্টের যেই সেলফে যা থাকার কথা, চোখ বন্ধ সেইটাই খুইজা পাবেন। ম্যাকডোনালাইজেশন গোটা আমেরিকার বৈচিত্র্যকে এক প্রোডাকশন লাইনের কিউতে খাড়া কইরা ফেলছে! যে দিকেই যান, রাস্তা হারানোর কোন উপায় নাই! কোথায় কখন কত মিনিটে যাবেন সব পাক্কা জেনে যাবেন! অবাক হওয়ার কোন উপায় নাই!
এরা বন্ধুদের সাথে গাল-গল্প করতে হইলে “স্টোরি” খুইজা পায় না, ড্রিঙ্কিং স্টোরি/ ট্রাভেল স্টোরি এদের সম্বল। আমাদের দেশী জীবন গল্প দিয়েই তো ঠাসা। আমাদের ওপেনিং সেন্টেনস , ক্লোজিং সেন্টেনসের বালাই নিয়া দুর্ভাবনা নাই! কারো সাথে চা নিয়া বসলেই তো গল্প! আমাদের বাড়িতে যারা কাজ করতে আসে, তাঁদের প্রত্যেকে এক একটা মহা স্টোরিটেলার। তাঁদের জীবন এক একটা মহাকাব্য। তাঁদের যে কারো জীবনী লিখতে পারলে বুকার পুরস্কার পাওয়া কঠিন হবে বইলা মনে হয় না! হোয়াইট পিপলের স্টোরি নিয়ে এতো পেরেশান হইতে দেখে আমার বড়ই মায়া লাগে।


হোয়াইট পিপলের “প্রাইভেসি” র ধারনাটা আমি এখনও বুইঝা উঠতে পারি না। ‘প্রাইভেসি’ প্রায় একটা ধর্মীয় মাহাত্ম্যপূর্ণ বস্তু। কাউকে কিছু জিজ্ঞাস করবার আগে তাঁর লিমিট ক্রস করতেছেন কিনা, বুঝে উঠতে উঠতে আলাপ চালানোর বিষয়ই খুইজা পাওয়া কঠিন। ওদিকে ফোনে সারাদিন অজানা- অচেনা নানা লোকে নানা জিনিস বেচার জন্যে অবিরাম ফোনে যখন তখন আপনাকে যে কোন ব্যক্তিগত সময়ে যে কোন প্রশ্ন নিয়ে লম্বা আলাপ জুড়ে দেয়ার সময় অনুমতির বালাই নাই। ভাই, আপনারে আমার ফোন নম্বর কে দিলো? আপনার সাথে আমি কেন কথা বলবো? আপনে কে? আম্রিকার কোম্পানিরা আমাদের যাবতীয় ব্যক্তিগত তথ্য ভাণ্ডারে জমা কইরা ইচ্ছা মত ব্যাবসায়িক মুনাফা বানাইতেছে। মাঝে মাঝে আমার মেমরি, আমার জীবনী সম্পর্কে ওদের অগাধ জ্ঞান দেখে ভূত দেখার মত চমকায়ে যাই! মার্কেটিং এর প্রয়োজনে আম্রিকাতে সবই জায়েজ! মানুষ না খাইয়া থাকলে কোন পরোয়া নাই, কিন্তু প্রাইভেসি লঙ্ঘন করলে বিরাট অপরাধ!

আমাদের জীবনের “গোল” থাকা বড়ই কঠিন। গোলপোস্টই ক্ষণে ক্ষণে বদলায়, গোল নিয়া চিন্তা ছাইড়াই আমরা হুদাই মনের আনন্দে দৌড়াইতে থাকি। হোয়াইট পিপলদের “গোল” ছাড়া জীবন নাই! হুদাই কিছু আলাপ, হুদাই বইসা থাকা, হুদাই দূরে তাকায়ে কিছু সময় কোন “গোল” ছাড়া থাকার আরাম বেচারারা কল্পনা করতে পারে না। কিচ্ছু না কইরা বইসা থাকার সুখ বেচারারা জানতে পারে নাই! সব চাইতে মায়া লাগে বরফ গলার পরে রোদ উঠা নিয়া তাঁদের আনন্দের আতিশয্যে আর কুকুর-বেড়ালের কাছে সঙ্গ খুঁজে নিতে দেখে! এইখানে বইলা রাখা ভাল যে, রোদ দেইখা আমিও মনমুগ্ধ হই এবং কুকুর-বিড়ালের কিউটনেসে বিগলিত না হওয়ার কোন উপায় নাই! এই প্রসঙ্গে বাহুল্য না হইলে জানাইতে পারি, আমার গ্র্যান্ডক্যাটের নাম আলেক্স!


শ্রেণী-লিঙ্গভেদে কি কি ভেদাভেদ তা নিয়া আজ আলোচনা নাই বা করলাম ! “হোয়াইট পিপল” বইলা কোন জেনেরেলাইজেশনে সম্ভব কিনা সেই প্রশ্নে বিজ্ঞ জনেরা আমাকে ধরাশায়ী করতে পারেন। কিন্তু “হোয়াইট পিপলস প্রব্লেম” তাতে দূর হবে না। দুঃখের কথা এই যে, এদের জীবনের নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতা, বোরডোম, আবেগ অনুভবের অনুমতি না থাকা, মানবিক আত্মপ্রকাশ বঞ্চিত হওয়া নিয়ে জগতবাসীর বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নাই! এই প্রব্লেমের জন্যে আজ পর্যন্ত কেউ আগায়ে আসছেন কিনা আমার জানা নাই! ব্রাউন পিপলদের ব্যাপারটা নিয়া গভীর চিন্তা ভাবনার প্রয়োজন আছে কিনা সেইটা চিন্তার ভারও বিজ্ঞজনের হাতে সঁইপে দেয়া ভাল বইলাই মনে করি!