পরীমণি ইস্যুতে আমি কিছু ব্যাপার খেয়াল করলাম। আমার সমাজ বুঝতে চাওয়ার প্রক্রিয়ায় এটা বেশ রসদ যুগিয়েছে। সমাজ বলতে এখানে বাঙালি ও আদিবাসী উভয় সমাজকেই বুঝাচ্ছি। যদিও প্রত্যেক কম্যুনিটির সমাজ সাংস্কৃতিক মাত্রাভেদে পরস্পর হতে ভিন্ন। তারপরও শেয়ারড হিস্ট্রি ও শেয়ারড সংস্কৃতি অনুযায়ী আমি আদিবাসী ও বাঙালি সমাজকে দুইটি বর্গে ভাগ করে লেখাটা লিখছি। পরীমণি ইস্যুতে এই দুটি সমাজ বর্গের প্রতিক্রিয়া কিছু জায়গায় অভিন্ন এবং কিছু জায়গায় মাত্রাভেদে ভিন্ন।

পরীমণি ইস্যুতে বাঙালি সমাজের প্রতিক্রিয়া যেমনটা হওয়ার ছিলো তেমনটাই হয়েছে। মিডিয়াকে সেক্যুলার হিসেবে দাবী করে নারীবান্ধব বলে ভাবতে চাওয়ার যে প্রবণতা অনেকের মধ্যে কাজ করে তারা ভেবে দেখতে পারেন মিডিয়া কীভাবে নারী ইস্যুকে প্রেজেন্ট করে থাকে। সেখানে কি ধরণের শব্দ চয়ন থাকে, কি কি লেন্স কাজ করে সেগুলা একটু তলিয়ে দেখলে মিডিয়ার পুরুষালিতা বোঝা যায়। কিন্তু আমি ভাবছি আদিবাসীদের মধ্যকার প্রতিক্রিয়া দেখে। আদিবাসী সমাজে মদ খাওয়া কোনো অচ্ছুত ব্যাপার নয়। তাই মদ নিয়ে বাঙালি সমাজে যে রাখ রাখ ঢাক ঢাক ফ্যান্টাসী কাজ করে, তেমন কোনো ফ্যান্টাসী আদিবাসী সমাজে নাই। তাহলে তারা পরীমণি ইস্যুতে কী বলছে? সেটাই মজার ব্যাপার।

Pori Moni: A Dazzling Star in Bangladeshi Cinema
পরীমণি

আমি কিছু ন্যারেটিভ দেখতে পেলাম। সেগুলো ধরে আগাতে পারি। তাদের মতে পরীমণি ‘শরীর’ দিয়ে মিডিয়ায় এসছে, সো তার চরিত্র খারাপ, তাই তার এমন পরিণাম ঠিকাছে। চরিত্রের এই ধারণা আদিবাসী সমাজে কীভাবে হলো সেটাকে মেজরিটির ইনফ্লুয়েন্স দিয়ে বোধহয় বুঝা সম্ভব। অর্থাৎ কোনো অঞ্চলে সংখ্যাগরিষ্ঠদের রীতি নীতি, মূল্যবোধ, আচার সংখ্যালঘুদের মধ্যে গৃহীত হওয়া। পরীমণির ‘শরীর বিলানো’ এই ধারণার সাথে নারীকে ভার্জিনিটি ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির মানদন্ডে ভাবতে চাওয়ার যোগসূত্র আছে, যা কিনা পুরোপুরি বাঙালি সমাজের একটি সাংস্কৃতিক আচরণ যা সমাজ রূপান্তরের পরিক্রমায় এতোদূর এসছে। এই দর্শনে নারীর পারিবারিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান সুনির্দিষ্ট করে চিহ্নিত। অর্থাৎ নারীর শরীর, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক অবস্থা নির্ধারিত হবে পুরুষকর্তৃক। অপরদিকে আদিবাসী সমাজে নারীর শরীর ও মনের সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়া কিছুদিন পূর্বেও এমন ছিলো কি? কৃষি নির্ভর সমাজ ব্যবস্থায় নারীর যে ভূমিকা ছিলো ঘরে কিংবা বাইরে, সেখানে নারীকে পুরুষ কীভাবে দেখতো?

আদিবাসীদের একটা পেইজে দেখলাম বলা হচ্ছে নারীদের সৌন্দর্য ও শরীর দেখানোর যে চল আছে ইন্ডাস্ট্রিতে, সেই দৌড়ে সামিল হওয়ার নেতিবাচকতা নিয়ে নারীদের ভাবা উচিত। ন্যারেটিভটা আমার কাছে ধর্ষণের ওই ন্যারেটিভের মতোই মনে হলো। অর্থাৎ পুরুষ মাত্রই যৌন লালসাগ্রস্থ, তাই নারীদের উচিত পোশাক সামলে চলা কিংবা নিজের সেফটির কথা চিন্তা করে সামাজিক ও ব্যক্তিগত পরিসর নিয়ন্ত্রন করা। এই ন্যারেটিভের কিছু সমস্যা আছে। এক, পুরুষের যৌনতার আচারকে প্র‍্যাকটিসের মধ্যে না রেখে তাকে স্বভাবজাত বা প্রাকৃতিক বলে ক্রেডেন্সিয়ালিটি দেয়া। দুই, নারীর সিদ্ধান্তকে বশে আনা। ইন্ডাস্ট্রিতে নারীর প্রেজেন্টেশন নিয়ে যে ন্যারেটিভটা বলা হচ্ছে সেখানেও একই ব্যাপার দেখা যায়। অর্থাৎ ইন্ডাস্ট্রিতে এমনটা হয় এবং হবেই। এর ব্যত্যয় ঘটা সম্ভব না। তাই ‘পয়মন্ত’ কিংবা ‘ভালো’ নারীদের উচিত সেই লাইনে না দাঁড়ানো। অথচ প্রশ্ন হওয়া উচিত যে, কেনো ইন্ডাস্ট্রিতে নারীদেরকে শরীরের বাইরে দেখানো হয় না।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, ইন্ডাস্ট্রি তো আসলে সমাজের বাইরে কিছুই নয়। বরং ইন্ডাস্ট্রি আসলে সমাজের যে কালেক্টিভ ডিজায়ার তারই একটি রূপ মাত্র এবং এই সমাজ পুরুষের সমাজ। নারী সেখানে এক্ট করে মাত্র। সমাজে নারীকে কীভাবে দেখা হয় সেটা নিয়ে ইংরেজীতে একটা টার্ম আছে ‘মেইল গেইজ’, যার বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘পুরুষের চোখ’। নারীর কি দেখে পুরুষ এবং সে কি দেখাতে চায়। এই যে ‘দেখাতে চাওয়া’ বললাম, এইটা আসলে কেবল কথার কথা না। ইন্ডাস্ট্রিতে পুরুষের যে কর্তৃত্ব সেটাকেই নির্দেশ করছি। ক্যামেরার পেছনে কয়জন নারী কাজ করেন? যারা কাজ করেন, তাদের কাজ কতটা স্বীকৃতি পায়? বাংলাদেশে কতজন নারী ফিল্মমেকার আছেন? কেনো তাদের সংখ্যা এতো কম? তাদের জার্নিটা কেমন? সেইসব নারীদের সিনেমায় নারী চরিত্ররা কেমন? আমরা সেই আলাপগুলো কতটা করি? ইন্ডাস্ট্রি কীভাবে পুঁজির একটা বিরাট খেলা সেই আলোচনা নাহয় আরো দূরের আলাপ। আমরা অতদূর দেখতে পারি না। কিন্তু যেটুকু দেখতে পাই সেইটার মধ্যেও আলাপগুলো আসলে কতটা বাইনারীর বাইরে? এটা ভালো নাকি খারাপ- এই বাইনারী লেন্সের বাইরে কতটা দেখতে পারি কিংবা দেখতে চাই?

যদি ওই বাইনারী জাজমেন্টের বাইরে দেখতে পারতাম তাহলে হয়তো বুঝতে পারতাম মিডিয়া কিংবা ইন্ডাস্ট্রি কীভাবে নারীকে রিপ্রেজেন্ট করছে। এই রিপ্রেজেন্টেশন থেকে মেইল গেইজ এন্ড ফিমেইল গেইজের পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়। দেখা গেছে নারী নির্মিত সিনেমায় নারীকে বাস্তবের একটা চরিত্র হিসেবে দেখানোর প্রয়াস থাকে, অপরদিকে পুরুষ নির্মাতার সিনেমায় নারীকে দেখানো হয় সাবমিসিভ, দুর্বল, পরাঙ্মুখ, যেখানে নারীকে শরীরকেন্দ্রীক চরিত্র হিসেবেই তুলে ধরা হয়। এই আলোচনায় অনেকের হয়তো মাথায় আসবে যে বাংলা সিনেমাতে এমন হয়। বাংলা সিনেমা দেখার অযোগ্য। আমি দেখেছি পরিচিত বর্গের অনেককেই ঢালিউডের সিনেমার সাথে বলিউডের সিনেমাকে তুলনা করতে। বলতে শুনেছি ঢালিউডের উচিত বলিউডের রিপ্রেজেন্টেশনকে ফলো করা। অথচ চকচকে যে বলিউড সেখানেও কিন্তু ব্যতিক্রম কিছু দেখা যায় না এবং ক্যামেরার পেছনের গল্পও আসলে একই। তো, তার মানে কি দাঁড়ালো? ভেতরের ব্যাপারটা একই থাক, সমস্যা নেই। রিপ্রেজেন্টেশনটা যেমনই হোক, মূল হচ্ছে মিডিয়াম। আইটেম গানের জনপ্রিয়তা কীভাবে হলো, সেটা ঢালিউড পর্যন্ত কীভাবে আসলো তার ইতিহাসটা সমাজ ও সময়ের বাস্তবতার নিরিখে দেখলে ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়।

নারীকে কেনো শরীর সর্বস্ব হিসেবে দেখানো হয় এইসব পপুলার প্লাটফর্মে সেইগুলা আর মূখ্য বিষয় নয়। বরং মূখ্য বিষয় নারীর শরীর দেখতে কতটা দৃষ্টিনন্দন। কে নায়িকা হওয়ার যোগ্য সেটা শরীর ও সৌন্দর্যের মানদন্ড দিয়ে জরিপ করে থাকি। ইভেন পুরুষও আসলে এই ফ্রেমের কতটা বাইরে? তারপরও স্টোরিতে পুরুষের তাগদ দেখানোর প্রয়াস থাকে, যাকে বলা যায় মাস্কুলিনিটির মডার্ন বহিঃপ্রকাশ। সে নায়ক কারণ সে নায়িকাকে রক্ষাকারী, সে দেশের লড়াকু সৈনিক কিংবা শহীদ। সে নায়ক কারণ সে জিতিয়ে দেয় অনেককেই। আর নারী নায়কের সেই যাত্রায় হয় তার লড়াইয়ের উদ্দেশ্য, নাহয় বড়জোর মানসিক সহযোগী। নায়কের মা কিংবা নায়িকা চরিত্রকে কেমনে দেখানো হয় সেগুলা কয়েকটা পপুলার সিনেমা দেখলেই বুঝা যায়। ইভেন মুক্তিযুদ্ধের যে সিনেমাগুলা সেখানেও দেখা যায় বলতে ‘মাকে বাঁচাতে এই যুদ্ধ’ কিংবা ‘দেশমাতৃকার জন্য যুদ্ধ’ কিংবা ‘প্রেমিকার সম্ভ্রমের জন্য যুদ্ধ’।এইসব ন্যারেটিভে যখন নায়িকা কিংবা নারীকে অবলা, পুরুষের পৌরুষের প্রতি নির্ভরশীল হিসেবে দেখানো হয়, তখন পপ কালচার খেকো লোকজন কেনো ভিন্ন কিছু ভাববেন? নাকি পপ কালচারে নারীকে এভাবে রিপ্রেজেন্ট করাটা আসলে সমাজের মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত বলে স্ক্রিণেও তা-ই দেখানো হয়? নাকি সমাজ কিংবা পপ কালচারের এই ন্যারেটিভ আসলে একে অপরকে প্রভাবিত করে মাত্র?

এই প্রশ্নগুলার মধ্য দিয়েই আসলে পরীমণি ইস্যুতে লোকের প্রতিক্রিয়াকে বোঝা যায় আর কি। এবং এই ইস্যুতেই আদিবাসী সমাজে পরীমণি ইস্যুতে যে জাজমেন্ট দেখা গেছে তারও সুরাহা পাওয়া যায়। কোনটা অপরাধ আর কোনটা অপরাধ না- সেটা পুরুষ ও নারী ইস্যুতে লোকমনে ভিন্নতার কারণ বোঝা যায়। আদিবাসী সমাজ যখন রূপান্তরের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তখন জেন্ডার, পরিবার, সম্পর্ক ইস্যুতে তারা কীভাবে রিএক্ট করছে সেটাকে মেজরিটির এইসব ইনফ্লুয়েন্স দিয়ে বুঝতে হবে। আবার এসব দেখেই ধারণা করা যায়, সমাজের এই রূপান্তরের যাত্রায় সাংস্কৃতিক কি কি পরিবর্তন ঘটছে। সমাজ তো আসলে পোশাক কিংবা ভাষা নয়। ওগুলা আউটার লেয়ার মাত্র। অভ্যন্তরে আছে তারা কীভাবে একে অপরকে দেখছে, সম্পর্ক চর্চা করছে, তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, পরিবার-শ্রেণী-বন্ধুত্ব-সম্পর্ককে কীভাবে ইভালুয়েট করছে, শরীর-সৌন্দর্যের ধারণা কেমন হচ্ছে, মডেস্টি-কার্টেসীর ধারণা কীরকম হচ্ছে-এইসব নিয়েই। এগুলাই মূলত একটা সংস্কৃতির ডাইমেনশন ঠিক করে দেয়। ওই জায়গা থেকে দেখে প্রশ্ন উঠে, পরীমণি কিংবা নারীকেন্দ্রিক ইস্যুতে আদিবাসীরা যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান, তা আসলে তাদেরকে বাঙালী সাংস্কৃতিক চেতনার লেন্স থেকে কতটা আলাদা করে?